প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড় দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। সীমান্তে পুশ-ইন, পেঁয়াজ ও গরু রপ্তানি বন্ধ এবং উভয় হাইকমিশন ঘিরে পাল্টাপাল্টি কঠোর অবস্থানের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে বাদ দিয়ে মালয়েশিয়া এবং তারপর চীনে যান। বেইজিং সফরকালে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল গালিচা সংবর্ধনা জানানো হয়। এই সফর নিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, নবভারত টাইমস ও ইন্ডিয়া টুডেসহ ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়।
সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি সই হয়। এর মধ্যে ১৩টি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে, তিনটি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-সম্পর্কিত এবং একটি বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দলীয় পর্যায়ে স্বাক্ষরিত হয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এই সমঝোতার আওতায় রয়েছে। বেইজিং ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ও মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মংলায় চীনের জন্য দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ঘোষণা আসে।
মংলা বন্দর ঘিরে ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, মংলা বন্দরের পাশে আগে ভারতের জন্য বরাদ্দ থাকা প্রায় ১১০ একর জমি অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে সেখানে চীনের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল চূড়ান্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের গোয়াদর ও আফ্রিকার জিবুতি বন্দরে চীনের যে বিনিয়োগের ধারা রয়েছে, মংলা তার নতুন সংযোজন হতে পারে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর প্রসঙ্গও উঠে আসে।
তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, খনন ও বন্যা ঝুঁকি কমাতে চীনের কারিগরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে এই সফরে, যা নিয়ে দ্য প্রিন্ট ও দ্য হিন্দুর মতো ভারতীয় গণমাধ্যম মন্তব্য করেছে যে প্রকল্পটি শিলিগুড়ি করিডর বা 'চিকেন নেক'-এর নিকটবর্তী হওয়ায় ভারতের কাছে স্পর্শকাতর বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা খাতেও আলোচনা এগিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ চীনের তৈরি ২৪টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা করেছে, যার চূড়ান্ত চুক্তি আগস্ট মাসে সম্পন্ন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি কার্যকর হলে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে এই যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী দেশ। এ ছাড়া পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত আলোচনার জন্য 'টু প্লাস টু' সংলাপ কাঠামো নিয়েও সমঝোতা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় চীনের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের নেতার সঙ্গে বৈঠকে চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।
এই সফরের প্রেক্ষাপটে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার দিনই বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন। ২৮ জুন থেকে আবেদন এবং ১ জুলাই থেকে ভিসা প্রদান শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় দুই বছর এই ভিসা সেবা বন্ধ ছিল।
আরও পড়ুন:








