সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে জমার পরিমাণ ছিল ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ, ২০২৫ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ফ্রাঙ্কে। বর্তমান বাজারদরে প্রতি সুইস ফ্রাঁ ১৫২ টাকা হিসেবে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ বছরের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমার রেকর্ড এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যের আড়ালে এই অর্থের একটি বড় অংশ দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সুইস ব্যাংক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, দুবাই ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ সুইস ব্যাংকের জমার তুলনায় অন্তত ১০ গুণ বেশি হতে পারে। সেই হিসেবে গত দেড় বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২ লাখ কোটি টাকা বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির দেওয়া তথ্যানুসারে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছিল। তবে বর্তমান তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ পাচারের হার বিগত আমলের গড় রেকর্ডকেও অতিক্রম করেছে।
এদিকে, বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে দায়িত্ব পালন করা একাধিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ অধিকাংশ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির খতিয়ান জমা পড়েছে। বিশেষ করে আসিফ নজরুল ও আসিফ মাহমুদের সুইজারল্যান্ড সফর এবং তাদের সম্পদের উৎস নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহফুজ আলম ও সারজিস আলমের বিরুদ্ধেও অর্থ পাচারের সংশ্লিষ্টতায় বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আর্থিক খাতের সংস্কার ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এর আগে আশ্বাসের কথা জানালেও পরবর্তী সময়ে তিনি বিষয়টিকে সময়সাপেক্ষ বলে উল্লেখ করেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি ব্যতীত দুবাইয়ে নিজের মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ ওঠায় বর্তমানে তিনি নিজেই তদন্তের মুখে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসন অর্থ পাচার ইস্যুকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। একই সময়ে সরকারের কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও তাদের স্বজনরা নির্দিষ্ট কিছু পাচারকারীর সম্পদ রক্ষায় প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশের সম্পদ রক্ষায় এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলনিরপেক্ষ ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ নাগরিকরা।
আরও পড়ুন:








