দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে এক বছরে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়কালের এই হিসাব অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার সকালে সেবা খাতে দুর্নীতি শীর্ষক জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এর ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানানো হয়।
২০২৩ সালের জরিপের তুলনায় ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ আগের তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে, যার পরিমাণ এখন ৫ হাজার ১২৪ টাকা। একই সময়ে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া খানার জাতীয় হার বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ ও ২৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নমুনাকাঠামো ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে দুই ধাপে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করে এই জরিপ পরিচালনা করে টিআইবি। জরিপে দেশের ১৭টি নির্দিষ্ট সেবা খাতের চিত্র তুলে ধরা হয়। এর আগে ২০২৩ সালে এই জরিপ পরিচালনা করেছিল সংস্থাটি।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট সেবা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যার হার ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এরপরের অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, যার হার ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও দুর্নীতির উচ্চ হার লক্ষ করা গেছে। খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ সর্বোচ্চ বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যাংকিং ও ভূমি খাতে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারিক সেবায় ঘুষ ও দুর্নীতির উচ্চহার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ খাতে দুর্নীতির প্রবণতা বেড়েছে অথবা আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। দুর্নীতির শিকার হওয়া সত্ত্বেও ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি।
জরিপে অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর বড় অংশ মনে করে, পুরো সেবা ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত। প্রায় অর্ধেক পরিবার জানায়, দুর্নীতির অভিযোগ কোথায় ও কীভাবে করতে হয় সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পর্কে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার অবগত থাকলেও সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার। অভিযোগ দায়েরের হার এই সচেতনতার তুলনায়ও কম, এবং অভিযোগ দায়ের করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয়নি বা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অভিমত অনুযায়ী, দুর্নীতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিচারহীনতা, সচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বদলে সুবিধা পাওয়ার প্রবণতা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এই পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি কঠিন। বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেবাগ্রহীতাদের এখনও দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো শহরের তুলনায় বেশি ঘুষের শিকার হয়েছে, যার হার গ্রামে ৬৬ শতাংশ এবং শহরে ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ঘুষের পরিমাণের দিক থেকে শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোকে অপেক্ষাকৃত বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের অনুপাতে তুলনামূলক বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:








