পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের কিলিং নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে বিস্তৃত ছিল বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। রোববার রাজধানীর পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে অবস্থিত ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর অপহরণের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একজন সেনা কর্মকর্তা সাক্ষী হিসেবে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার সাক্ষ্যে জাফলংয়ে পরিচালিত একটি অভিযানের বিবরণ উঠে আসে। সাক্ষ্য অনুযায়ী, র্যাবের টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামিকে নিয়ে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা জাফলংয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ভারত থেকে আসা একদল ব্যক্তি আরও দুজন ব্যক্তিকে নিয়ে আসেন এবং পরে বিনিময়ের মাধ্যমে আসামিদের হস্তান্তর করা হয়।
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ভারত থেকে আনা দুই ব্যক্তিকে পথিমধ্যে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ রয়েছে। তিনি জানান, বিডিআরের বিভিন্ন সদস্যকে দুটি পদ্ধতিতে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কাউকে ইনজেকশন প্রয়োগ করে, আবার কাউকে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এই দুই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ থেকে ১২ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
গত ১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ১০৪ জনকে হত্যার ঘটনায় তিনটি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ও এডিজি অপারেশন্স হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে জিয়াউল আহসান একাধিক বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, তার সরাসরি নির্দেশ ও অনুমোদনে তার অনুগত র্যাব সদস্যরা এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করত।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে সেনাবাহিনীর মেজর পদে র্যাবে পদায়নের পর থেকে জিয়াউল আহসান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। এর ফলে ২০২৪ সালে মেজর জেনারেল পদে বাধ্যতামূলক অবসরের আগ পর্যন্ত তাকে আর সেনাবাহিনীতে ফিরতে হয়নি। হাসিনা সরকারের পুরো মেয়াদে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থায় কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কোর্স বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করে এবং কোনো ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড বা ফর্মেশন কমান্ডের অভিজ্ঞতা ছাড়াই জিয়াউল আহসান মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পান, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা বলে প্রসিকিউশনের অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:








