মঙ্গলবার

২৩ জুন, ২০২৬ ১০ আষাঢ়, ১৪৩৩

এনআইডি দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ, শুনানি সোমবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬ ১০:৫৯

শেয়ার

এনআইডি দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ, শুনানি সোমবার
ছবি সংগৃহীত

দেশের প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি সংবেদনশীল দরপত্র প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের আইডিইএ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের এই দরপত্রে কারিগরি মূল্যায়নের নম্বর গোপন রাখা, আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণের সময় দরদাতাদের নোটিশ না দেওয়া এবং বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ লঙ্ঘন করে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি দরপত্রের চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন কার্যক্রম স্থগিত করে আগামী সোমবার, ২২ জুন সকাল ১০টায় শুনানির দিন ধার্য করেছে। শুনানিতে আইডিইএ প্রকল্প পরিচালককে টেন্ডার নোটিশ, টেন্ডার ডকুমেন্ট, ওপেনিং রিপোর্ট, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও চুক্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় সব মূল নথি নিয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ও বিপিপিএ সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অধীন আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস বা আইডিইএ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের আওতায় বাংলাদেশ ভোটার রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম ও অটোমেটিক বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি গ্রহণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডেটা মাইগ্রেশন ও প্রশিক্ষণের কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কোয়ালিটি অ্যান্ড কস্ট বেইজড সিলেকশন পদ্ধতিতে পরিচালিত এই দরপত্রে কারিগরি মূল্যায়নে ৮০ শতাংশ এবং আর্থিক প্রস্তাবে ২০ শতাংশ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত ৩১ মার্চ দরপত্র জমা ও উন্মুক্তকরণের পর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে দুটি প্রতিষ্ঠান, সিনেসিস আইটি লিমিটেড এবং ডায়নামিক সলিউশন ইনোভেটরস লিমিটেড।

গত ৭ জুন বিপিপিএ রিভিউ প্যানেলে দায়ের করা আবেদনে সিনেসিস আইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরী মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, কিউসিবিএস পদ্ধতিতে কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ, আর্থিক মূল্যায়ন ও সম্মিলিত মূল্যায়ন সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ র‍্যাংকিংপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা লঙ্ঘন করা হয়েছে।

সোহরাব আহমেদ চৌধুরী বলেন, কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ সভার তারিখ, সময় বা স্থান সম্পর্কে সিনেসিস আইটিকে জানানো হয়নি। কারিগরি মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশ না করেই আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করা হয় এবং সিনেসিসের অজ্ঞাতে দ্রুততার সঙ্গে ডিএসআইয়ের অনুকূলে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করা হয়। তিনি আরও জানান, ই-জিপি পোর্টালে আলোচনা, ডিব্রিফিং ও ক্ল্যারিফিকেশন সংশ্লিষ্ট ট্যাবগুলোতে কোনো রেকর্ড না থাকায় বাধ্যতামূলক আলোচনা ও অবহিতকরণের কোনো ধাপ সম্পন্ন হয়নি।

আবেদনে বলা হয়, সিনেসিস আইটির আর্থিক প্রস্তাব ছিল ১৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা প্রতিদ্বন্দ্বী ডিএসআইয়ের ২০ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রস্তাবের তুলনায় কম। এই অবস্থায় ডিএসআইকে বিজয়ী ঘোষণার ক্ষেত্রে কারিগরি মূল্যায়নের স্কোরই মূল নিয়ামক হওয়ার কথা, কিন্তু সেই স্কোর এখনো প্রকাশ করা হয়নি, যা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।

সিনেসিস আইটির এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, গত ২৪ মে দুপুরে আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, ঈদের ছুটির ঠিক আগের দিন, ডিএসআইয়ের অনুকূলে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করা হয়। তিনি জানান, ই-জিপি পোর্টালে বাধ্যতামূলক আলোচনা, ডিব্রিফিং ও ক্ল্যারিফিকেশন সংশ্লিষ্ট কোনো রেকর্ড নেই এবং ঈদের ছুটির কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানের আপিল করার সাত দিনের আইনি সময়সীমাও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ১৪১ এর উপবিধি ১০ অনুযায়ী, সম্মিলিত কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে বিবেচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম কারিগরি নম্বর অর্জনকারী আবেদনকারীদের চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিটি প্রস্তাবে প্রাপ্ত কারিগরি নম্বর প্রদর্শনপূর্বক একটি প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রণয়ন বাধ্যতামূলক। বিধি ১৪২ এর উপবিধি ১ অনুযায়ী, কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের পর ন্যূনতম কারিগরি স্কোর অর্জনকারী আবেদনকারীদের আর্থিক প্রস্তাবের প্রকাশ্য উন্মুক্তকরণ সভায় উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান জানাতে হয়। আর বিধি ১৪২ এর উপবিধি ২ অনুযায়ী, প্রকাশ্য প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ সভায় মূল্যায়ন কমিটিকে ন্যূনতম কারিগরি স্কোর অর্জনকারী প্রতিটি প্রস্তাবের ব্যয় সহকারে প্রাপ্ত কারিগরি স্কোর ঘোষণা করতে হয়।

এ ছাড়া ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান আইডিইএর নিজস্ব আরএফপি ডকুমেন্টের ইনস্ট্রাকশন টু কনসালট্যান্টসের ৪২ দশমিক ১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কিউসিবিএস ও এফবিএস পদ্ধতির ক্ষেত্রে কারিগরি মূল্যায়ন সম্পন্ন ও অনুমোদিত হওয়ার পর ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ ই-জিপি সিস্টেমের মাধ্যমে নির্ধারিত ন্যূনতম কারিগরি নম্বর অর্জনকারী পরামর্শকদের অবহিত করবে এবং বিজ্ঞপ্তিতে আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণের তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ থাকবে, যা সাধারণত বিজ্ঞপ্তি জারির অন্তত এক সপ্তাহ পর নির্ধারণ করতে হয়। ৪২ দশমিক ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উন্মুক্তকরণের সময় পরামর্শকদের নাম, কারিগরি নম্বর ও প্রস্তাবিত মূল্য উচ্চস্বরে ঘোষণা ও যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হয় এবং ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্য উন্মুক্তকরণের কার্যবিবরণী প্রস্তুত করতে হয়। এই নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে।

বিপিপিএর পরিচালক মোহাম্মদ আলী আহম্মেদ খান গত ১৫ জুন আইডিইএ প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি বা চুক্তি কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। পরদিন ১৬ জুন বিপিপিএ রিভিউ প্যানেল-৩ এর চেয়ারম্যান মো. আলী কাদের আরেকটি নোটিশে সোমবারের শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবকে উপযুক্ত প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ জানান। শুনানিতে অংশ নিতে সিনেসিস আইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরীকেও ডাকা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিপিপিএর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিউসিবিএস পদ্ধতিতে কাজ করা হলে প্রকাশ্য প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ সভায় মূল্যায়ন কমিটিকে ন্যূনতম কারিগরি স্কোর অর্জনকারী প্রতিটি প্রস্তাবের ব্যয় সহকারে প্রাপ্ত কারিগরি স্কোর ঘোষণা করতে হবে এবং তা না করা হলে আইন লঙ্ঘিত হবে।

আইডিইএ প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী দাবি করেন, সব নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে এবং বিষয়টি যেহেতু এখন রিভিউ প্যানেলের অধীনে রয়েছে, তাই এ নিয়ে মন্তব্য করা সবার জন্য বিব্রতকর হবে। তিনি জানান, তারা বিপিপিএর কাছে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।

টেন্ডারে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, তিনি বিষয়টি শুনেছেন। নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে তদন্ত করবে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত হলে হতে পারে, কিন্তু যেহেতু অভিযোগকারীরা একটি লিগ্যাল ফোরামে অভিযোগ করেছেন, সবচেয়ে ভালো হবে সেখানেই বিষয়টির সমাধান হওয়া এবং সেই ফোরামের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা।

নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আইডিইএ প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে এনআইডি, ভোটার তালিকা ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করলেও এর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আগে থেকেই অনিয়ম ও অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, দেড় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সব ভোটারের হাতে স্মার্ট এনআইডি কার্ড পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি, যদিও প্রকল্পের আওতায় বিদেশ সফরসহ বিভিন্ন ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অতীতে ডেটা সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটিকে সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ সুবিধা পায়। এ কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ছিল বলে তারা জানান। ২০১৪ সালে স্মার্টকার্ড মুদ্রণ সংক্রান্ত দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে নিষিদ্ধ করলেও নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এর সম্পৃক্ততা অব্যাহত ছিল।

কর্মকর্তারা আরও জানান, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডেটা সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সম্প্রতি টাইগার আইটি ডেটা সেন্টারের পাসওয়ার্ড হস্তান্তর করলেও এখনো সোর্স কোড হস্তান্তর করেনি বলে তারা দাবি করেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইডিইএ প্রকল্পের আওতায় স্মার্টকার্ড পার্সোনালাইজেশন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের যন্ত্রপাতি, জনবল ও ব্ল্যাঙ্ক কার্ড নির্বাচন কমিশনের হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই এই কাজের জন্য বিএমটিএফ অর্থ গ্রহণ করেছে এবং যন্ত্র মেরামতের নামে অর্থ দাবির বিষয়ে তদন্তে অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।



banner close
banner close