বিগত দুই দশক ধরে দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় ক্ষত ‘যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি’ বা যুবক কেলেঙ্কারি। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অবৈধ ব্যাংকিং ও প্রতারণার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২০ বছর। কিন্তু ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসেও ভুক্তভোগী সংগঠনের দাবি অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ৩ লাখ পরিবার তাদের জমানো টাকা ফেরত পাননি। সাবেক সরকারগুলোর সময়ে গঠিত একাধিক তদন্ত কমিশনের সুপারিশ এবং আদালতের নানা নির্দেশনা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের কার্যকর পদক্ষেপই এখন এই লাখ লাখ সর্বস্বান্ত মানুষের শেষ ভরসা।
ভয়াল প্রতারণার ইতিহাস ও আটকে পড়া তহবিল:
১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করা ‘যুবক’ মূলত মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (MLM) এবং উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও যুবকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে তার প্রতিশ্রুত অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় এবং ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যুবক তার গ্রাহকদের কাছে প্রায় ২ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ভুক্তভোগী সংগঠনের দাবি, দীর্ঘ দুই দশকে সুদ, মুদ্রাস্ফীতি ও সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
কমিশনের সুপারিশ ও দীর্ঘদিনের আইনি অচলবস্থা:
কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পর ২০১০ সালে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে এবং ২০১১ সালে সাবেক যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পৃথক দুটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, উভয় কমিশনই যুবকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি চিহ্নিতকরণ, ক্রোক এবং বিক্রয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের সুপারিশ করেছিল।
এছাড়া ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করে। তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
আইনি প্রতিকারের আশায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকেরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন এবং প্রশাসক নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে রুল জারি হলেও দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
দুই হাজার কোটি টাকার দায়, ছয় থেকে আট হাজার কোটি টাকার সম্পদ: কোথায় সমাধান?
ভুক্তভোগী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যুবকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি, আবাসন প্রকল্প ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। রাজধানীর পুরানা পল্টনে অবস্থিত যুবকের সাবেক প্রধান কার্যালয় ‘বিকে টাওয়ার’সহ বিভিন্ন সম্পত্তি বছরের পর বছর দখল, অব্যবস্থাপনা বা আইনি জটিলতার মধ্যে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ‘যুবকে ক্ষতিগ্রস্ত কল্যাণ সোসাইটি’ এসব সম্পত্তি সরকারি হেফাজতে নিয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনটির সদস্যদের অভিযোগ, সম্পদের একটি অংশ বেদখল হয়ে আছে অথবা যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এর প্রকৃত মূল্য ও ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যুবকের দায় প্রায় ২ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগী প্রতিনিধিদের মতে, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সম্পদগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। অর্থাৎ যথাযথভাবে সম্পদ উদ্ধার, সংরক্ষণ ও বিক্রয় করা গেলে প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় সম্পদের মূল্য বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণেই ক্ষতিগ্রস্তরা মনে করেন, দ্রুত সরকারি তত্ত্বাবধানে সম্পদ পুনরুদ্ধার ও লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরু করা হলে তাদের মূল বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বর্তমান সরকারের প্রতি ভুক্তভোগীদের আকুতি:
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এবং সরকারের ঘোষিত আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে যুবকের ভুক্তভোগীরা মনে করেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক কেলেঙ্কারির এই ঘটনাটিও সরকারের সংস্কার উদ্যোগের আওতায় আনা উচিত।
তাদের দাবি, বিশেষ আইনি ব্যবস্থা বা প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে যুবকের বেদখল ও বিতর্কিত সম্পত্তি উদ্ধার, সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন এবং দ্রুত লিকুইডেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হোক।
দীর্ঘ ২০ বছরের অপেক্ষা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীরা।
যুবকে ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগী মৃত আহসান আরিচ খানের স্ত্রী শাহানা আক্তার সেলিনা, যিনি নিজেও একজন ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য, বলেন, 'আমার স্বামী এবং আমি দুজনেই আমাদের জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় যুবকে জমা রেখেছিলাম। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, এই অর্থ আমাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভিত্তি হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আমরা আমাদের ন্যায্য পাওনা ফিরে পাইনি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, আমার স্বামী তার প্রাপ্য অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষাতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আজ আমি শুধু নিজের জন্য নয়, তার অপূর্ণ প্রত্যাশার পক্ষ থেকেও কথা বলছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন, মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে যুবক কেলেঙ্কারির একটি স্থায়ী সমাধান করা হোক, যাতে জীবিত ভুক্তভোগীরা অন্তত তাদের প্রাপ্য বুঝে পান এবং আর কোনো পরিবারকে আমাদের মতো দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভার বহন করতে না হয়।'
আরেক ভুক্তভোগী মোঃ আবুল কাশেম বলেন, 'আমরা কোনো অনুদান, সহানুভূতি বা বিশেষ সুবিধা চাই না; আমরা চাই আমাদের বৈধ ও কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত। তদন্ত কমিশন, আদালতের নির্দেশনা এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সুপারিশে সমস্যার সমাধানের পথ বহু আগেই দেখানো হয়েছে। এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। যুবকের সম্পদগুলো দ্রুত সরকারি তত্ত্বাবধানে এনে সুষ্ঠুভাবে মূল্যায়ন, পুনরুদ্ধার ও লিকুইডেশনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করা হোক। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আমরা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছি; বর্তমান সরকারের কাছেই আমাদের শেষ আশা।'
আরও পড়ুন:








