রবিবার

১৪ জুন, ২০২৬ ৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের যত অপকর্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৬ ১৮:২৪

শেয়ার

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের যত অপকর্ম
ছবি সংগৃহীত

ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুবাই পুলিশ ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করে। রোববার এ তথ্য নিশ্চিত করেন পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) শাহাদাত হোসেন।

গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ পেলে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জমি দখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে।

কর্মজীবন ও অভিযোগের সূচন

বেনজীর আহমেদ ১৯৮৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বে থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ

২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত র‍্যাবের মহাপরিচালক এবং পরবর্তীতে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র‍্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাতজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন। ট্রেজারি বিভাগ তখন জানায়, ২০০৯ সাল থেকে ৬০০-এর বেশি গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০ বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে র‍্যাবের বিরুদ্ধে।

অবৈধ সম্পদ ও অর্থ পাচার

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দাখিল করা চার্জশিট অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে প্রায় ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ ঘোষণা করলেও দুদকের তদন্তে যথাক্রমে ৭ কোটি ৫২ লাখ ও ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে। এ ছাড়া তার মেয়ে জাহরা জাবিন বিনতের সম্পদও সম্পদ বিবরণীতে গোপন করা হয়েছিল বলে তদন্তে প্রমাণ মেলে।

অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে তার স্ত্রী জিসান মির্জার নামে দুবাইয়ে ১ কোটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার দিরহাম মূল্যের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে। এ ছাড়া সেখানকার দুটি ব্যাংক হিসাবে ১ লাখ ৬২ হাজার দিরহাম পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ জব্দ ও হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য চেয়ে মিউচুয়াল লিগ্যাল রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে দুদক।

জমি দখল ও সম্পদের বিস্তার

আদালত ইতোমধ্যে বেনজীর ও তার পরিবারের নামে থাকা ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও বেনিফিশিয়ারি ওনার্স হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৫ মার্চ একদিনেই ঢাকার গুলশানের র‍্যাংকন আইকন টাওয়ারে ৯ হাজার ১৯২ বর্গফুটের চারটি ফ্ল্যাট কেনা হয়, যার দাম মাত্র ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল।

মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে সাভানা ইকো রিসোর্টের নামে ৬০০ থেকে ৬২১ বিঘা জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে এলাকার সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারগুলোকে ভয় দেখিয়ে জমি বিক্রিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জেও হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জমি কম দামে কেনা এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ নিয়ে দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা সেন্ট মার্টিনে ১ দশমিক ৭৫ একর এবং কক্সবাজারের ইনানী সৈকতের কাছে স্ত্রী-কন্যাদের নামে ৭২ শতক জমি কেনার তথ্যও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

রিসোর্টের কাজ তদারকিতে পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ বলেন, ব্যক্তিগত কাজে পুলিশের ব্যবহার সম্পূর্ণ অপরাধমূলক।

মামলা, চার্জশিট ও পরোয়ানা

দুদকের অনুসন্ধান চলাকালে ২০২৪ সালের ৪ মে সপরিবার দেশ ছেড়ে যান বেনজীর আহমেদ। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর তার ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। চলতি বছরের মার্চে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং মে মাসে তার অনুপস্থিতিতেই অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির আবেদন করলে নোটিশ জারি হয় এবং তার ভিত্তিতেই দুবাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।



banner close
banner close