মঙ্গলবার

২৩ জুন, ২০২৬ ৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

ভূমিধস জয়ের পর তারেক সরকারের কঠিন পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬ ১৮:০৬

শেয়ার

ভূমিধস জয়ের পর তারেক সরকারের কঠিন পরীক্ষা
ছবি সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তিন মাস পূর্ণ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন একযোগে অর্থনীতি, সুশাসন, কূটনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চারটি প্রধান চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকার দেশি-বিদেশি ঋণের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা একসঙ্গে অর্থনীতিকে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও ক্রমে বাড়ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ নিতে হচ্ছে। এই চাপ সামলাতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং অনুকূল শর্তে বৈদেশিক ঋণ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা করছে এবং বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে কিছুটা সমঝোতা হয়েছে। বিনিয়োগ পরিস্থিতি চাঙা না হলে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণ-উভয় খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

সুশাসনের প্রশ্নে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সর্বক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত না হলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আসবে না। তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তি, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল এবং জুলাই সনদ এখনো বাস্তবায়ন না হওয়া সুশাসন প্রতিষ্ঠার অনুকূল নয়।

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবীর বলেন, ভারত, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখতে হলে আগে অর্থনীতিকে চাঙা করতে হবে। অর্থনীতি স্থিতিশীল না হলে বিনিয়োগ আসবে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অস্থিরতা বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং দলীয়করণ ইস্যুতে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরব অবস্থানে রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, বিরোধী দলের অসন্তোষ আরও বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হবে।

অন্যদিকে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, কোটি মানুষের দলকে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ রাখা যাবে না এবং উপযুক্ত সময়ে দল তার অধিকার আদায়ে মাঠে নামবে।

তবে সরকারের ইতিবাচক কিছু উদ্যোগও আলোচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা চলাফেরা, ঈদের পর দ্রুত বর্জ্য অপসারণ তদারকি, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড বিতরণ এবং খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন দেশের ওপর বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে গেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ নয়, তবে প্রধানমন্ত্রী দেশ ও মানুষের স্বার্থে সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাবেন।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা একমত যে, তিন মাস কোনো সরকারের চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। তবে শুরুর রাজনৈতিক সুবিধা ধরে রাখতে হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারকে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।



banner close
banner close