জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং গণভোটের রায়ের আলোকে সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে মতপার্থক্য ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর ভিন্ন অবস্থানের কারণে বিষয়টি সংসদ, আদালত এবং রাজপথে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে দলটি সনদের মূল চেতনা ধারণ করলেও সংস্কার অবশ্যই সংবিধানসম্মত ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে হবে। দলটির মতে, সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কেবল জাতীয় সংসদের রয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের মিত্র দলগুলো গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের বক্তব্য, গণভোটে জনগণের দেওয়া নির্দেশনা অনুসারেই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত।
সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিরোধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ গত ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐকমত্য ব্যাহত হলে সংসদের ভেতরে ও বাইরে নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক আলী রীয়াজ সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, জনগণের প্রত্যাশা এবং সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে পরিস্থিতি সংকটময় হতে পারে। তিনি সংস্কার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সাধারণ জনগণকে বৃহৎ পরিসরে রাজপথে নামানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে জনগণের প্রধান উদ্বেগ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। তাঁর মতে, সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংসদীয় আলোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুবও মনে করেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও এ ইস্যুতে বড় ধরনের গণআন্দোলনের সম্ভাবনা সীমিত। তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশ্লিষ্ট গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া রিট মামলায় তিনি আইনজীবী হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ২০২৫ সালের গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট বিচারাধীন রয়েছে। বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ আগামী ১৭ জুন রুল শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন। এর আগে পৃথক দুটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেন।
জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস এবং জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া ও ফিরোজ আহমেদ তাঁদের লিখিত মতামতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছিলেন।
উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব নিয়েও বিভিন্ন মহলে মতভেদ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
এদিকে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের জন্য জাতীয় সংসদে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিটিতে সরকারি দলের ১২ জন এবং বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য রাখার কথা রয়েছে।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জুলাই সনদের বিষয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল সদস্যদের নাম জমা দিলে কমিটির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে জামায়াতে ইসলামী এখনো কমিটিতে প্রতিনিধির নাম দেয়নি। দলটির ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন জানান, তাদের দল সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবর্তে মতভেদ সৃষ্টি করেছে। তিনি জানান, তাদের দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেনি এবং সনদের কয়েকটি প্রস্তাবের সঙ্গে তারা একমত নয়।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের রায় এবং সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আগামী দিনগুলোতে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকতে পারে।
আরও পড়ুন:








