বুধবার

৩ জুন, ২০২৬ ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

অর্থাভাবে বিপর্যস্ত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ জুন, ২০২৬ ২২:৩৫

শেয়ার

অর্থাভাবে বিপর্যস্ত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন
ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তীব্র অর্থসংকটে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ৩৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গত দুই মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। ব্যাংক হিসাব প্রায় শূন্যে নেমে আসায় সংস্থাটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় প্রায় ১৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় হয় ১২ লাখ টাকা। সরকারি তহবিল থেকে সর্বশেষ গত মার্চে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছিল। এরপর মার্চ ও মে মাসের বেতন এখনো অপরিশোধিত রয়েছে। ঈদুল আজহার আগে এপ্রিল মাসের বেতন দিতে ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিনা সুদে এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ঋণ দিয়েছেন। তবে ঈদ বোনাস দেওয়া সম্ভব হয়নি।

সিইও কামাল আকবর জানান, যাঁরা এখানে কাজ করছেন তাঁদের পরিবার আছে। ঈদে বাড়ি যাওয়ার আগেও তাঁরা বেতন পাননি। মানবিক বিবেচনায় তিনি তাঁর পেনশনের অর্থ থেকে ঋণ দিয়েছেন। তিনি আরও জানান, একটি অর্থবছরের বরাদ্দ দিয়ে দুটি অর্থবছর পার করা হয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হলেও নতুন বাজেট বরাদ্দ মেলেনি।

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং আহত ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালে সরকার এই ফাউন্ডেশন গঠন করে। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকার প্রাথমিক অনুদান দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ কোটি এবং সাধারণ মানুষের অনুদান মিলিয়ে মোট তহবিল দাঁড়ায় ১১৯ কোটি টাকায়।

প্রথম পর্যায়ে এক হাজারের বেশি আহত ও শহীদ পরিবারকে অনুদান দেওয়া হয়। গুরুতর আহতদের চোখ, হাত-পা ও স্নায়ুসংক্রান্ত জটিল অস্ত্রোপচার এবং থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। পরবর্তী সময়ে কোনো বড় সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান না আসায় চলতি বছরের শুরু থেকেই তহবিলে টান পড়তে শুরু করে।

ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সামসি আরা জামান জানান, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে গুরুতর আর্থিক সংকটে রয়েছে এবং কর্মীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি ফাউন্ডেশনটি বন্ধ করে দিতে চান। তহবিলের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

সামসি আরা জামান আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে ১৮ মে নির্ধারিত সময়ে গিয়েও সাক্ষাৎ মেলেনি। পরদিন ১৯ মে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও মন্ত্রী ঈদের পরে দেখা করবেন বলে জানান। শহীদ পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে সেখানে অপেক্ষা করতে গিয়ে তিনি এই পরিস্থিতিতে পড়েন।

পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি সময় দেন এবং আন্তরিকভাবে জানান যে তহবিল বরাদ্দের বিষয়টি তাঁর এখতিয়ারে নেই। সংসদে বরাদ্দ উত্থাপনের জন্য স্পিকারের কাছেও আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সিইও কামাল আকবর জানান, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে সাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে ফাউন্ডেশন।

সামসি আরা জামান মনে করেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনকে দুর্বল বা বিলুপ্ত করা মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকেই ক্ষুণ্ন করা। ফাউন্ডেশন যে সেবা দিয়ে আসছে, তা সরকারের অন্য কোনো কাঠামোর মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বেতন না পাওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশও ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে বলে তিনি জানান।



banner close
banner close