২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর বিশেষ ক্ষমতা আইনে কারাবন্দি ৪২৬ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির পর এদের একটি বড় অংশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুরোনো অপরাধ নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে এলাকাভিত্তিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেজগাঁও, ফার্মগেট ও কাওরান বাজার এলাকা একজন জামিনপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যার বিরুদ্ধে ৯টি হত্যা মামলাসহ মোট ২২টি গুরুতর মামলা ছিল এবং যিনি ২৭ বছর কারাভোগের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। তার অনুসারীরা কাওরান বাজারের কাঁচামালের আড়ত, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসা এবং রেলওয়ে ওয়াগন থেকে পণ্য চুরির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।
মিরপুর, কাফরুল, কচুক্ষেত ও ইব্রাহিমপুর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস বাহিনী। ৬টি হত্যা মামলাসহ প্রায় এক ডজন মামলার আসামি আব্বাস ২০০৩ সালে গ্রেফতার হয়ে ২১ বছর কারাগারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট জামিনে মুক্তির পর তিনি দেশ ছেড়েছেন। তিনি জানান, চিকিৎসার জন্য তিনি থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন এবং তার বিরুদ্ধে সব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে তার দীর্ঘদিনের সহযোগীরা কাফরুল, কচুক্ষেত ও ইব্রাহিমপুর এলাকায় পুরোনো চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট পুনরুজ্জীবিত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল বাহিনী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকাভুক্ত হেলালের বিরুদ্ধে ৪টি হত্যা মামলাসহ ৮টি গুরুতর মামলা রয়েছে। ২০০১ সালে গ্রেফতার হওয়া হেলাল প্রায় ২৩ বছর পর ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান। এরপর থেকে মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, লেগুনা ও বাস স্ট্যান্ড থেকে অর্থ আদায় এবং জেনেভা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ধানমন্ডি, কলাবাগান ও বাড্ডা এলাকায় সক্রিয় শীর্ষ সন্ত্রাসী খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। পুলিশ কর্মকর্তা হত্যাসহ ১৩টি মামলার আসামি রাসু দুই দশকেরও বেশি সময় কারাবন্দি ছিলেন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার বাহিনীর সদস্যরা বাড্ডার সাঁতারকুল ও বেরাইদ এলাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক কমিশন আদায় করছে।
চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা ও ট্রানজিট গালিব হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে কলাবাগান ইমন ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির পর তিনি পুরোনো সিন্ডিকেট পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়েছেন। ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট এলাকায় রেস্তোরাঁ, শোরুম ও বহুতল ভবন নির্মাণকারীদের কাছ থেকে তার বাহিনী মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করছে।
মিরপুর-পল্লবী এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুন বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করে পল্লবীর ঝুট ও ডিশ ব্যবসা এবং ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। তার বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি মিরপুরে তার গ্রুপের সঙ্গে প্রতিপক্ষ গ্রুপের বেশ কয়েকটি সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
জামিনপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলাল বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ওই বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুরের পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যায় সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুনের নাম উঠে এসেছে। ১০ নভেম্বর আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুন হত্যায় কিলার ইমনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত হন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার ২ নম্বর শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন, যিনি ছিলেন সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, যেসব সন্ত্রাসী অপরাধজগতে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অপরাধ করলে যে কাউকেই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালত তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
আরও পড়ুন:








