দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা দেশের আটটি অব্যবহৃত বিমানবন্দর পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে বগুড়া ও ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রকল্প বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বোর্ড সভায় অনুমোদন পেয়েছে। একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা জানান, জনচাহিদা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে পর্যায়ক্রমে এসব বিমানবন্দরের কার্যক্রম শুরু করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হবে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে উন্নয়নের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১০ হাজার ৫০০ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এতে বোয়িং ৭৩৭-৮০০সহ বড় আকারের যাত্রী ও কার্গো উড়োজাহাজ অবতরণ করতে পারবে। প্রকল্পের আওতায় চারতলা আধুনিক টার্মিনাল ভবন, কন্ট্রোল টাওয়ার, কার্গো কমপ্লেক্স এবং উন্নত আইএলএস ক্যাট-৩বি প্রযুক্তি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ঘন কুয়াশার মধ্যেও নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণ নিশ্চিত করবে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির নকশা ও কারিগরি সমীক্ষা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-কে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। গত ২৮ এপ্রিল এ বিষয়ে বুয়েট প্রতিনিধিদের সঙ্গে বেবিচকের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরামর্শক নিয়োগের পর ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ নকশা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৬০০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমান বাহিনী-র সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নবায়ন এবং রানওয়ে নিরাপত্তা এলাকা উন্নয়নের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। গত ৭ মে মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বগুড়া বিমানবন্দর এলাকা পরিদর্শন করেন।
অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শিবগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরটি ১৯৪০ সালে প্রায় ৫৫০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭৭ সালে রানওয়ে সংস্কার করা হলেও যাত্রীসংকটের কারণে ১৯৮০ সালে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সীমিত সংস্কার করা হলেও সেখানে নিয়মিত ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে বিমানবন্দরটির অবকাঠামো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। টার্মিনাল ভবন ও কন্ট্রোল টাওয়ার প্রায় অকার্যকর। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধারও ঘাটতি রয়েছে। ৬ হাজার ফুট রানওয়ে থাকলেও আধুনিক লাইটিং ও নেভিগেশন সুবিধা নেই।
বেবিচকের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর আধুনিকায়নে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে তিন বছর। প্রথম ধাপে ৫৮২ একর জমি অধিগ্রহণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন টার্মিনাল ভবন, কন্ট্রোল টাওয়ার ও নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ২০ মে মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর এলাকা পরিদর্শন করে।
এ ছাড়া বেবিচকের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা, শমশেরনগর, খানজাহান আলী ও পটুয়াখালী বিমানবন্দরসহ মোট আটটি অব্যবহৃত বিমানবন্দর ধাপে ধাপে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই, যাত্রী চাহিদা এবং অর্থনৈতিক কার্যকারিতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে কোন বিমানবন্দর আগে চালু হবে তা নির্ধারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো চালু হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিপণ্য পরিবহন, পর্যটন বিকাশ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত যাত্রী চাহিদা এবং বাণিজ্যিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে এসব প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।
এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত ও সম্ভাব্যতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
বর্তমানে দেশে তিনটি আন্তর্জাতিক এবং পাঁচটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্প্রতি কক্সবাজার বিমানবন্দর-কে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা দেওয়া হলেও এটি এখনও পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
আরও পড়ুন:








