আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ধারাবাহিক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সর্বশেষ মার্চ ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিচালিত ১০টি মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের প্রায় ৪ হাজার ৯২ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্টাফ অফিসার ও সামরিক পর্যবেক্ষকসহ মোট বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৩০০।
জাতিসংঘের সর্বশেষ র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর তালিকায় নেপাল প্রথম, ভারত দ্বিতীয়, রুয়ান্ডা তৃতীয় এবং বাংলাদেশ চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, লেবানন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, আবেই অঞ্চল, লিবিয়া ও সাইপ্রাসে দায়িত্বরত আছেন। পদাতিক ব্যাটালিয়ন, নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, এয়ারফিল্ড সার্ভিস ইউনিট এবং ফর্মড পুলিশ ইউনিট এসব মিশনে মোতায়েন রয়েছে।
দিবস পালন প্রসঙ্গে
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। তবে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির কারণে এ বছর বাংলাদেশে দিবসটির আনুষ্ঠানিক আয়োজন আগামী ১০ জুন করা হবে। আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে-শান্তিতে বিনিয়োগ করুন।
যাত্রার সূচনা ও বিস্তার
১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রথম অংশগ্রহণ ছিল ইউনাইটেড নেশনস ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভার গ্রুপ মিশনে, যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক অংশ নেন। একই বছর নামিবিয়ায় জাতিসংঘ ট্রানজিশন অ্যাসিস্ট্যান্স গ্রুপ মিশনে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশও শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৯৩ সালে কম্বোডিয়ায় প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ পদাতিক ব্যাটালিয়ন পাঠানো হয়, যা বড় পরিসরে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা অংশগ্রহণের সূচনা করে। নব্বইয়ের দশকে সোমালিয়া ও রুয়ান্ডায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সময় যখন অনেক দেশ সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, তখন বাংলাদেশ অতিরিক্ত সৈন্য পাঠিয়ে নিজের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ রাখে।
সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মানবিক ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ তেজান কাব্বাহ বাংলাকে সম্মানসূচক দাফতরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন।
২০১০ সালে লেবাননে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগরে বহুজাতিক নৌ টাস্কফোর্সে বাংলাদেশের প্রথম অংশগ্রহণ ঘটে।
শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪০টি দেশের ৫৪টি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ পর্যন্ত ১৬০ জনের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করেছেন।
নারী শান্তিরক্ষীদের অনন্য অর্জন
শান্তিরক্ষায় নারীর অংশগ্রহণে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। ২০১৫ সালে হাইতিতে জাতিসংঘের মিনুস্তাহ মিশনে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুসলিম নারী ফর্মড পুলিশ ইউনিট পাঠিয়ে বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস তৈরি করে। ১৬০ সদস্যের এই ইউনিটকে নিয়ে জার্নি অব এ থাউজ্যান্ড মাইলস: পিসকিপারস শিরোনামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়।
ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতেও বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে নারী ফর্মড পুলিশ ইউনিট পাঠাচ্ছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে সেখানে দায়িত্বরত বাংলাদেশি নারী পুলিশ সদস্যরা একাধিকবার জাতিসংঘ মেডেল লাভ করেছেন। জাতিসংঘে নারী পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে যৌন সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের সহায়তায় নারী শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা বিশেষভাবে কার্যকর। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল সমাজগুলোতে বাংলাদেশি নারী পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় নারীদের কাছে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, মানসিক সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
বৈশ্বিক সংকট ও চ্যালেঞ্জ
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এখন সবচেয়ে বড় জনবল ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে। বর্তমানে ১১টি মিশনে প্রায় ৫০ থেকে ৫১ হাজার সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্য নিয়োজিত, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় ৪৯ শতাংশ কম। যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দাতা দেশগুলোর অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোননির্ভর অপপ্রচার, সাইবার ঝুঁকি, বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক বিভক্তি এবং জটিল আঞ্চলিক সংঘাত শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে।
১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শান্তিরক্ষী বিশ্বশান্তির জন্য জীবন দিয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালেই কর্তব্যরত অবস্থায় মারা গেছেন ৫৯ জন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি বলেছেন, বর্তমান অস্থির বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায়। তবে এর জন্য অবিচল রাজনৈতিক সমর্থন ও নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন অপরিহার্য।
আরও পড়ুন:








