বুধবার

২৭ মে, ২০২৬ ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

বিএনপি সরকারের ১০০ দিন: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ মে, ২০২৬ ১১:৩৮

শেয়ার

বিএনপি সরকারের ১০০ দিন: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক
ফাইল ছবি

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ করেছে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা এবং গভীর সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়া এই সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ নিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল। সরকার মন্ত্রিসভায় গৃহীত ৬০টি সিদ্ধান্তের ৬২ শতাংশ বাস্তবায়নের দাবি করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কার্যকর অগ্রগতি এখনো দৃশ্যমান হয়নি।

সরকারের দাবি

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে মোট ৬০টি নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

কৃষি খাতে ডিজিটাল কাঠামো প্রবর্তনে কৃষক কার্ড চালু এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদ মওকুফ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পসহ দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং এস আলম গ্রুপের প্রায় ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দের বিষয়টিও তুলে ধরেন মাহদী আমিন।

অর্থনীতি: সংকট ব্যবস্থাপনার সময়কাল

অর্থনীতিবিদরা এই ১০০ দিনকে মূলত সংকট ব্যবস্থাপনার সময় হিসেবে বিবেচনা করছেন। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতি সরকারের সামনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তিনি আরও জানান, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া এবং সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণগ্রহণের প্রবণতা আগের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলোকে আরো ঘনীভূত করছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ব্যাংকিং আইন সংশোধন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকারের প্রতিশ্রুতি এখনো স্পষ্ট হয়নি। আসন্ন বাজেটেই বোঝা যাবে সরকার অর্থনীতি নিয়ে আসলে কী ভাবছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা: প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে

রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির প্রত্যাশা থাকলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই ও মব ভায়োলেন্সের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগের কারণ হয়েই রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার প্রতিফলন, যা প্রত্যাশিত ছিল না। পুলিশ এখনো পেশাদারিত্বের প্রত্যাশিত পর্যায়ে ফিরতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে সেনাবাহিনীকে মাঠ পর্যায় থেকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া এবং সম্প্রতি মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণাকে পরিস্থিতি উন্নতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। মেহেরপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিষয়টিকে সরকার বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার নজির হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

র‌্যাব বিলুপ্তির পরিবর্তে একটি আইনি কাঠামোয় পুনর্গঠনের পরিকল্পনার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে।

রাজনৈতিক পরিবেশ ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে জুলাই সনদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনা তৈরি হয়। সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বিরোধী দলের সমালোচনার মুখেও পড়েছে সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, সরকার বিরোধী দলগুলোর সাথে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পরিবেশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার দিক থেকে ইতিবাচক। তবে জুলাই সনদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

স্বাস্থ্য খাতেও এই সময়কালে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। হামের প্রাদুর্ভাবে ৫০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের সার্বিক মূল্যায়ন

বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাত্র ১০০ দিনে পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে কর ব্যবস্থা ও ব্যাংকিং খাতের মতো কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা কঠিন হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ বাড়বে বলেও মত দেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা



banner close
banner close