বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তিটি নবায়ন হবে নাকি নতুন করে সমঝোতা হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছে। তবে নতুন চুক্তির কাঠামো নির্ধারণে পানি বণ্টনের ভিত্তি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মতপার্থক্যের মূল বিষয় হলো পানিপ্রবাহ নির্ধারণের ভিত্তি। ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে বিদ্যমান প্রবাহকে ভিত্তি করে চুক্তির কাঠামো চায়, অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবি পুরো গঙ্গা নদীর প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে পানি বণ্টন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির গ্যারান্টি ক্লজ পুনর্বহালের বিষয়টিও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যায্য পানি বণ্টনের জন্য শুধু ফারাক্কা নয়, পুরো গঙ্গা অববাহিকার প্রবাহকে বিবেচনায় নিতে হবে। তারা বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পরিবর্তে নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির সম্ভাবনাও বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান চুক্তিতে ফারাক্কা পয়েন্টের প্রবাহের ভিত্তিতে পানি বণ্টন করা হলেও উজানে প্রায় ৯৭৫টি বাঁধ ও অবকাঠামোর কারণে সেখানে পৌঁছানো পানির পরিমাণ স্বাভাবিক প্রবাহের প্রতিফলন নয়। ফলে ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তার মতে, পুরো গঙ্গা অববাহিকাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত পানি বণ্টন ব্যবস্থাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে।
ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত। ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকেই এ অঞ্চলে বিরোধ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে পাঁচটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
১৯৭৭ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রথম দীর্ঘমেয়াদি পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে গ্যারান্টি ক্লজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা রাখা হয়েছিল। তবে ১৯৮২ সালের পরবর্তী সমঝোতা স্মারকগুলোতে ওই গ্যারান্টি ক্লজ বাদ পড়ে।
সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমানভাবে পানি ভাগ করে নেয়। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পায় এবং অবশিষ্ট পানি ভারত ব্যবহার করে। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক গ্রহণ করে, বাকি পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়।
নদী গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকী বলেন, বিদ্যমান চুক্তিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকলেও চুক্তি না থাকলে বাংলাদেশের পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, গঙ্গার উল্লেখযোগ্য অংশের পানি নেপালের নদীগুলো থেকে আসে। তাই ভবিষ্যৎ চুক্তিতে নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে পানি ব্যবস্থাপনায় আরও ভারসাম্য আনা সম্ভব হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে অতীতের বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের পানির হিস্যা কমেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অনেক নদী চুক্তিতে পুরো অববাহিকার প্রবাহ এবং উজানে নির্মিত বাঁধ ও ব্যারাজের তথ্য ভাটির দেশের সঙ্গে ভাগাভাগির বিধান থাকলেও গঙ্গা চুক্তিতে সেই স্বচ্ছতা সীমিত।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে পদ্মা নদীর প্রবাহ কমে গেছে, যার প্রভাব দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনে পড়ছে। ২০২৫ সালের মার্চে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা এলাকায় যৌথ জরিপ পরিচালনা করেন এবং পরে যৌথ নদী কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জরিপের তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন। তবে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকায় চুক্তি নবায়ন প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই সময় ভারতের লোকসভায় এক প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানান, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা তখনও শুরু হয়নি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ কৌশল হতে পারে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, তিন দশক ধরে কার্যকর থাকা চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পানির একটি নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা। বিশেষ করে পরিকল্পিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পানি সরবরাহ নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
তিনি মনে করেন, নতুন করে পুরো চুক্তি উন্মুক্ত করে আলোচনায় গেলে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং পানির হিস্যা নিয়ে আরও দীর্ঘ ও কঠিন দরকষাকষির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই বিদ্যমান কাঠামো বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থসংরক্ষণমূলক সংশোধনের পথ অনুসন্ধান করাই অধিক বাস্তবসম্মত।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং ভারতের সঙ্গেও নিয়মিত আলোচনা চলছে। সরকারের লক্ষ্য ১৯৭৭ সালের চুক্তির ভিত্তিতে বা তার চেয়েও উন্নত কোনো সমঝোতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিকল্প প্রস্তুতি হিসেবে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, উভয় দেশের কারিগরি দল নিয়মিত সাইট পরিদর্শন ও তথ্য পর্যালোচনা করছে। তারা দেশে ফিরে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবে, যার ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন বা ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও শক্তভাবে সুরক্ষিত হবে। তার মতে, আগের চুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো বহাল রেখে পানির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে উভয় দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন:








