শুক্রবার

২২ মে, ২০২৬ ৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান, আরও ৫৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরের প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬ ০৮:২০

শেয়ার

বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান, আরও ৫৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরের প্রস্তুতি
ছবি সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের ধারাবাহিকতায় সরকার আরও ৫৩ জন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুলিশের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন ঈদের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপ কার্যকর করতে পারে। এই ৫৩ জনের মধ্যে ১৩ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩১ জন পুলিশ সুপার এবং ৯ জন সহকারী পুলিশ সুপার রয়েছেন, যাঁরা বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত আছেন।

জুলাই বিপ্লবের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তা অব্যাহত রেখেছে। এরই অংশ হিসেবে গত ৩ মে পুলিশের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, যাঁদের মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এর আগে গত ২২ এপ্রিল ১১ জন ডিআইজি ও দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে এবং ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আরও ৯ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।

এই অবসর প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি হিসেবে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ওই ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার জনস্বার্থে যেকোনো সময় তাঁকে অবসরে পাঠাতে পারে এবং এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর প্রয়োজন হয় না। পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী গত দেড় বছরে কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং আরও একাধিক কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে সম্প্রতি পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে গত ৫ মে ফেনীর পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়ন করা হয়, যাঁর বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা বিদ্যমান রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। মামলা দুটির মধ্যে একটি হলো ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল শিবগঞ্জ থানায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবদল নেতা মিজানের হত্যা মামলা, যেখানে মাহবুব আলম খান ১০ নম্বর আসামি। অপর মামলায় তিনি ৩ নম্বর আসামি। একইভাবে, ২০২২ সালে ভোলায় বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত জেলা ছাত্রদল সভাপতি নূরে আলমের হত্যা মামলার আসামি আরমান হোসেনকে কক্সবাজারের রামু থানার ওসি হিসেবে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং পরে সেই পদায়ন বাতিল করা হয়।

সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা এ প্রসঙ্গে বলেন, বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হলে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে এবং যাচাই-বাছাই করেই পদায়ন ও পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, আওয়ামী লীগ আমলে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা দলীয় স্বার্থে অপকর্মে লিপ্ত হয়েছেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। তিনি আরও বলেন, পুলিশ বাহিনীতে দলীয়করণ পুরো বাহিনীর সুনাম নষ্ট করে।

পুলিশ সূত্র জানায়, বর্তমানে পুলিশের ১১৪ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত অবস্থায় আছেন এবং এঁদের বড় অংশকে অবসরে পাঠানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে বর্তমান সরকার পেশাদার ও আস্থাভাজন কর্মকর্তার সংকটে পড়েছে বলেও সূত্রটি জানায়। আওয়ামী আমলে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ায় অনেক যোগ্য কর্মকর্তার মনোবল ভেঙে পড়েছে। ডিএমপি কমিশনার সাজ্জাত আলীর পদত্যাগের প্রায় সোয়া দুই মাস পর মোসলেহ উদ্দিন আহমেদকে ওই পদে নিয়োগ দিতে হয়েছে, যা এই সংকটেরই প্রতিফলন। পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, এই সংকট শিগগিরই কেটে যাবে।



banner close
banner close