পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দাখিল করা চার্জশিটের পরও ট্রান্সকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমিন রহমানসহ সব আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল অর্থের বিনিময়ে এই মামলায় হস্তক্ষেপ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলার বাদী ও ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক শাযরেহ হক আদালতের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন।
মামলার পটভূমি
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ২০২০ সালের ১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর বড় মেয়ে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে ভাই হত্যা, অর্থ আত্মসাৎ, সম্পত্তি দখল এবং অবৈধভাবে শেয়ার হস্তান্তরের অভিযোগ আনেন ছোট মেয়ে শাযরেহ হক। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে শাযরেহ হক ও তাঁর ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমান জালিয়াতির বিষয়টি পুরোপুরি শনাক্ত করতে সক্ষম হন এবং পরে মামলা দায়ের করেন।
জালিয়াতির অভিযোগ
মামলার নথি অনুযায়ী, ট্রান্সকম গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ার নিজের নামে নিতে ভাই-বোনের স্বাক্ষর জালিয়াতি করেছেন সিমিন রহমান। একই সঙ্গে ভুয়া পারিবারিক ডিড অব সেটলমেন্ট তৈরির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালে শেয়ার হস্তান্তরসংক্রান্ত একটি বোর্ড সভায় শাযরেহ হক ও আরশাদ ওয়ালিউর রহমান অনুপস্থিত থাকলেও তাঁদের স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে। লতিফুর রহমানের ভুয়া অনুমোদনের স্বাক্ষরও ওই সভার নথিতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর গুলশানে লতিফুর রহমানের নামে থাকা দুই বিঘা দুই কাঠা জমির ৩৫ কাঠা ভুয়া হেবা দলিল তৈরি করে নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন সিমিন রহমান। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে দাখিল করা ওই দলিলে বাবা ও ছোট বোনের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। শাযরেহ হক বিষয়টি জানতে পেরে অভিযোগ করলে ওই হেবা দলিলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
চার্জশিটের পরও অব্যাহতি
তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা শাজেদুর রহমান ছয়জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। তবে চার্জশিট দাখিলের পরও আদালত বাদীপক্ষের বক্তব্য না শুনে সিমিন রহমানসহ সব আসামিকে অব্যাহতি দেন। এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বাদীর অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
মামলার বাদী শাযরেহ হক বলেন, আদালত তাঁদের আবেদন না শুনেই মামলাটি খারিজ করেছেন। তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, সব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য না শুনেই সব আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁরা উচ্চ আদালতে আবেদন করেছেন বলে জানান শাযরেহ হক।
আসিফ নজরুলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই মামলায় হস্তক্ষেপ করেছেন এবং তাঁর প্রভাবেই মামলার গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ট্রান্সকম গ্রুপের দুটি প্রকাশনা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক যথাক্রমে মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ আইনজীবী তৌফিকা করিমকে ব্যবহার করে আদালত থেকে অনুকূল আদেশ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে।
দুদকের অনুসন্ধান
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১০০ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। মামলাগুলো ধামাচাপা দিতে এই ঘুষ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছর নভেম্বরে দুদকের একজন উপপরিচালককে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অভিযোগটি অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।
আরও পড়ুন:








