বুধবার

২০ মে, ২০২৬ ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

হামের টিকা সংকটে ১০ বার সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ, প্রাদুর্ভাবের পর স্বীকারোক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২৬ ১৮:৩১

শেয়ার

হামের টিকা সংকটে ১০ বার সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ, প্রাদুর্ভাবের পর স্বীকারোক্তি
ছবি সংগৃহীত

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, বাংলাদেশে হামের রুটিন টিকার দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিয়ে তারা ২০১৯ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে সরকারকে সতর্ক করে আসছে। বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে কমপক্ষে ১০টি বৈঠক ও পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে সম্ভাব্য টিকা সংকটের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায় দেশে হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ছিল মাত্র এক-তৃতীয়াংশ

ইউনিসেফ প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশে দুই ডোজ মিলে প্রতিবছর হামের টিকার চাহিদা প্রায় সাত কোটি। অথচ ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মাত্র এক কোটি ৭৮ লাখ ডোজ সরবরাহ হয়, যা মোট বার্ষিক চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। এই ঘাটতির কারণে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং বহু শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।

চিঠি গেছে স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও

রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, টিকার সংকট নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হয়েছিল। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঠানো পাঁচ-ছয়টি চিঠির মধ্যে সর্বশেষ চিঠিটি বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিন আগে, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি পাঠানো হয়েছিল। তিনি বলেন, প্রতিটি বৈঠকে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল এবং সতর্ক করা হয়েছিল যে দেশে টিকার সংকট আসন্ন।

দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্বে সংকট গভীর হয়

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা ক্রয় প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে। রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, এ ধরনের সিদ্ধান্ত এর আগে নেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও উপযুক্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইউনিসেফের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের তিন বছরের সরবরাহ চুক্তি ছিল। এই চুক্তির আওতায় বৃহৎ পরিসরে ক্রয়ের কারণে তুলনামূলক কম মূল্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত মানসম্মত টিকা সরবরাহ সম্ভব হতো বলে জানান তিনি।

মে থেকে ফের শুরু হয়েছে রুটিন টিকাদান

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি বছরের মে মাস থেকে দেশে হামের রুটিন টিকা সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়েছে। বর্তমানে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে, আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি জোরদার করতে এবং টিকাদান কর্মসূচি পুনরুদ্ধারে একযোগে কাজ করছে।

ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে সতর্কতার আহ্বান

ইউনিসেফ প্রতিনিধি সতর্ক করে বলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে রুটিন টিকাদানে কোনো বিঘ্ন সহনযোগ্য নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ সরকার যদি বিকল্প উৎস থেকে মানসম্মত টিকা কম মূল্যে পেতে পারে, তাহলে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সরকারের রয়েছে এবং এ নিয়ে ইউনিসেফের কোনো আপত্তি নেই। তবে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, কোনো মহামারি হঠাৎ করে সংঘটিত হয় না বলে মন্তব্য করেন রানা ফ্লাওয়ার্স। বিশেষত টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সতর্কসংকেত পাওয়া যায় এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।



banner close
banner close