শুক্রবার

১৫ মে, ২০২৬ ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ইউনাইটেড গ্রুপের রাজা ও সানজারী কেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ মে, ২০২৬ ১৮:০৭

আপডেট: ১৫ মে, ২০২৬ ১৮:০৯

শেয়ার

ইউনাইটেড গ্রুপের রাজা ও সানজারী কেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে?
ছবি: সংগৃহীত

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকারকে আর্থিক সহায়তা, বিদেশে অর্থ পাচার, সরকারি সম্পদ দখল, বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম, কর ফাঁকি, বিএনপি ও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সময়কার দমন-পীড়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসন—এমন একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও ইউনাইটেড গ্রুপের শীর্ষ দুই ব্যক্তি হাসান মাহমুদ রাজা ও মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ সানজারীর বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন উঠেছে—প্রভাবশালী এই শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধারেরা কেন এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে?

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে ইউনাইটেড গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ এবং নেপচুন হাউজিং লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করে। গত ১৮ জানুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।

দুদকের আবেদনে বলা হয়, রাজাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জাল দলিলের মাধ্যমে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি দখল, অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থ পাচার এবং ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মাধ্যমে অনিয়ম করে আইপিপি রেটে গ্যাস সরবরাহ নেয়ার অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন। তদন্তের সময় তাঁদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে আদালতকে জানায় দুদক।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর প্রগতি সরণিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত বাহাদুর হোসেন মনির হত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আসামি করা হয়েছে হাসান মাহমুদ রাজা, মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ ও ইউনাইটেড গ্রুপের কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) আফজাল নাছেরকে। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকারকে অর্থায়ন করেছিল ইউনাইটেড গ্রুপ। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ইউনাইটেড গ্রুপের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি উঠলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো বড় পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা আফজাল নাছেরকে ‘পুনর্বাসন’:

বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এক-এগারোর সময় গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (বরখাস্ত) আফজাল নাছেরের বিরুদ্ধে। বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীকে ধরে এনে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে আফজাল নাছের। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইউনাইটেড গ্রুপ তাঁকে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথমে তিনি জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন) হিসেবে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী পরিচালক হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীনের সুপারিশেই ইউনাইটেড গ্রুপে আফজাল নাছেরের চাকরির ব্যবস্থা হয়। ওই সময় ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন হাসান মাহমুদ রাজা।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সহায়তা না দেয়ার অভিযোগ:

বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের জুনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে খালেদা জিয়ার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালের কাছে অ্যাম্বুলেন্স ও ওষুধ সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ সিদ্ধান্তে ইউনাইটেড গ্রুপের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা ছিল বলে অভিযোগ বিএনপির নেতাদের।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই ঘটনায় সরাসরি ভূমিকা ছিল আফজাল নাছেরেরও।

খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে ভূমিকা রাখা তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আব্দুল মুবীনের সঙ্গে পরবর্তীতে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে ইউনাইটেড গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজার। দুই পরিবার বেয়াই সম্পর্কেও আবদ্ধ হয়।

বর্তমানে মুবীন ইউনাইটেড পাওয়ারের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গ্রেপ্তার এড়াতে তাঁকে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করানো হয়েছে।

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা:

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উত্তর পাশে নির্মিত একাধিক বহুতল ভবন নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একসময় বন্ধ থাকা ওই প্রকল্প আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবার চালু হয়। পরে মালিকানায় আসে ইউনাইটেড গ্রুপ।

বিমানবন্দরটি কেপিআইভুক্ত স্থাপনা হলেও নীতিমালা উপেক্ষা করে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব ভবন থেকে বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকা সরাসরি দেখা যায়, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে ইউনাইটেড গ্রুপের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি কমমূল্যে সরকারি গ্যাস নিয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করেছে।

সব ধরনের নিয়ম ও এমনকি উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ উপেক্ষা করেই ঢাকা ইপিজেডে ৮৬ মেগাওয়াট ও চট্টগ্রাম ইপিজেডে ৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে ইউনাইটেড গ্রুপ। এই দুটি কেন্দ্র থেকেই বিপুল মুনাফা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ছাড়া আশুগঞ্জ পাওয়ার কমপ্লেক্সের একটি প্ল্যান্টের মালিকানাও বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর গোয়েন্দা বিভাগের অনুসন্ধানে ইউনাইটেড গ্রুপের বিরুদ্ধে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা কর ফাঁকির তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি গ্রুপটির কয়েকজন পরিচালক ব্যক্তি পর্যায়েও প্রায় ৪০ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে রাজউকের অনুমোদন ছাড়া ইউনাইটেড গ্রুপের করপোরেট অফিস এবং ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির ভবন নির্মাণেও নকশাগত জটিলতার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে রাজউক।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যুৎ, রিয়েল এস্টেটসহ নানা খাতে বিস্তৃত প্রভাব গড়ে তোলে ইউনাইটেড গ্রুপ। এখন সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতগুলো গুরুতর অভিযোগ, একাধিক মামলা ও দুদকের তদন্ত চলমান থাকার পরও যদি ইউনাইটেড গ্রুপের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে তা বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করবে।



banner close
banner close