শনিবার

৯ মে, ২০২৬ ২৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

ভারত-চীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চ শুল্কে ভর্তুকি চাপ বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯ মে, ২০২৬ ১১:০৩

শেয়ার

ভারত-চীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চ শুল্কে ভর্তুকি চাপ বাড়ছে
ছবি সংগৃহীত

ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত চারটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বেশি বলে মন্তব্য করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সরকারের অভ্যন্তরীণ এক নথিতে বলা হয়েছে, আগের সরকারের সময় করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) কিছু শর্তের কারণে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে রাষ্ট্রকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করে চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার চিন্তাও করছে সরকার।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় থাকা চারটি কেন্দ্র হলো ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি গ্রুপের গোড্ডা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র (মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট), পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র।

অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জন্য প্রস্তুত করা নথিতে বলা হয়েছে, এসব কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উচ্চ ট্যারিফের কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বিপুল ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই চার কেন্দ্রের জন্যই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ২৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আদানি পাওয়ারের জন্য সম্ভাব্য ভর্তুকি ধরা হয়েছে সাত হাজার ৮২১ কোটি টাকা, পায়রা কেন্দ্রের জন্য ছয় হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, রামপাল কেন্দ্রের জন্য ছয় হাজার ৮১৪ কোটি টাকা এবং আরএনপিএলের কেন্দ্রের জন্য ছয় হাজার ২৬০ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, চুক্তিগুলোতে রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই), নন-রেগুলেটেড রিটার্ন অন ইকুইটি (এআরওই), পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং হিট রেটের মতো আর্থিক উপাদান এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিদ্যুতের ট্যারিফ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি করেছে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটিও বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর চুক্তি ও ব্যয় কাঠামো পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে। কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে করা কয়েকটি চুক্তিতে অতিরিক্ত ব্যয় ও ঝুঁকির ভার রাষ্ট্রের ওপর চাপানো হয়েছে। বিশেষ করে ডলারভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থা, উচ্চ রিটার্ন নিশ্চয়তা এবং ক্যাপাসিটি চার্জ দীর্ঘমেয়াদে বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

তবে চুক্তি সংশোধনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি ঋণ। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে বিদেশি ঋণ এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি থাকায় ট্যারিফ কমাতে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এখন পর্যন্ত সেই অনুমোদন না পাওয়ায় সংশোধিত ট্যারিফ প্রস্তাব সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কয়লার মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আদানি গ্রুপ ও পিডিবির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে সালিশ পর্যায়ে রয়েছে। আদানির দাবি অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত তাদের পাওনা প্রায় ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৩৯৩ মিলিয়ন ডলার বিতর্কহীন।

বিদ্যুৎ বিভাগ আরও জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে পড়ায় সরকার এখন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করছে। উচ্চমূল্যে কয়লা আমদানি করেও এসব কেন্দ্র সচল রাখা হচ্ছে, ফলে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগের পায়রা এবং বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের রামপাল কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে রয়েছে। তবে আরএনপিএলের পটুয়াখালী কেন্দ্র এখনো পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রটির একটি ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বিল করতে পারছে না। এতে কয়লা কেনার জন্য অর্থ সংকট তৈরি হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই ঘাটতি বেড়ে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম ও চুক্তির শর্ত পর্যালোচনার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। যৌথ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিষয়ে ঋণদাতাদের সম্মতি প্রয়োজন, সেটি এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আলোচনা চলছে।’

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে কিছু কেন্দ্র অব্যবহৃত থাকলেও চুক্তির কারণে সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাত এখন আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।



banner close
banner close