শুক্রবার

৮ মে, ২০২৬ ২৫ বৈশাখ, ১৪৩৩

সংবিধান সংস্কারে পিআর নিয়ে অচলাবস্থার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ মে, ২০২৬ ১১:০৫

শেয়ার

সংবিধান সংস্কারে পিআর নিয়ে অচলাবস্থার শঙ্কা
ছবি এআই মাধ্যমে বানানো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরু থেকেই জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী জোটের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উচ্চকক্ষ গঠনে পিআর (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ এখন সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রধান জটিলতা হিসেবে সামনে এসেছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ আয়োজন করা হয়। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সদস্যরা দুই ধরনের শপথ নিলেও সরকারি দল বিএনপির সদস্যরা সংবিধানবিরোধী উল্লেখ করে সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এর জেরে শুরু থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

জুলাই সনদের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচিত হবেন। জামায়াত ও বিএনপিসহ ২৪টি দল এ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করলেও পরে উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপিসহ সাতটি দল ভিন্নমত দেয়। তাদের দাবি, উচ্চকক্ষ গঠনে ভোটের নয়, বরং নিম্নকক্ষের আসনের সংখ্যানুপাত বিবেচনায় নিতে হবে। এ কারণেই পিআর পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় বিতর্ক হয়। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ বিরোধী সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রশ্ন তুলে বক্তব্য দেন। পরে এ নিয়ে আনা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। একপর্যায়ে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে।

সরকারি দলের নেতারা একদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও অন্যদিকে এটিকে সংবিধানবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের ভাষ্য, সংবিধান সংশোধন ছাড়া জুলাই সনদের অনেক বিষয় বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিরোধী জোট এ অবস্থানকে গণভোটের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে দেখছে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। সংবিধান সংশোধনকে কেন্দ্র করে নতুন করে কমিটি গঠন ও দীর্ঘসূত্রতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, জনগণ সংস্কারের পক্ষেই রায় দিয়েছে এবং পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন ছাড়া জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণের সমর্থনের মাধ্যমে জুলাই সনদে দেওয়া নোট অব ডিসেন্টের কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে। ফলে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা জুলাই সনদ থেকে সরে আসেনি। সংসদের সমাপনী দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচন নিশ্চিত করতেই বিভিন্ন বিষয়ে আপস করে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বিএনপি জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কখনো আপস করেনি। তার মতে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো বড় বিষয়ে জনগণের সরাসরি রায় প্রয়োজন এবং সে কারণেই গণভোটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

তবে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিএনপি জুলাই সনদকে “অন্তহীন প্রতারণার দলিলে” পরিণত করেছে। তার ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবের পাশে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সনদের মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ছিল। একইসঙ্গে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও মৌলিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার এসব প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে সমঝোতা না হলে আগামী দিনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রশ্নটি এখন পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।



banner close
banner close