আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, উচ্চমূল্যের কয়লা ও গ্যাস আমদানি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাপ মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাত গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আগামী জুনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা বিদ্যুৎ বিভাগের এক বিশদ প্রস্তাবে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে বিদ্যমান ভর্তুকি কাঠামোর বাইরে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ, আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ড এবং যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নতুন করে ভর্তুকির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিপিডিবি উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে। ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের এই বড় ব্যবধানের কারণেই প্রতিবছর বিপুল আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এপ্রিল থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসেই অতিরিক্ত প্রায় ১৮ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হবে বলে হিসাব করা হয়েছে। অথচ বিদ্যমান বাজেটে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র তিন হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। ফলে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার সংস্থান এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় সরকার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-চীন ও বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে রয়েছে বিআইএফপিসিএলের রামপাল, বিসিপিসিএলের পায়রা এবং আরএনপিএলের পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে এসব কেন্দ্রের বিদ্যুতের ট্যারিফ এখনো পুরোপুরি অনুমোদিত না হওয়ায় আর্থিক হিসাব আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে অতীতের কিছু বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা পিপিএ নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে নির্মিত কেন্দ্রগুলোর চুক্তিতে উচ্চ ‘রিটার্ন অন ইকুইটি’, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় ও উচ্চ হিট রেট অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিদ্যুতের প্রকৃত দাম বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। তাদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা গেলে ট্যারিফ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে প্রকল্পগুলোর বিপরীতে বিপুল বৈদেশিক ঋণ এবং রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি থাকায় আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের অনুমোদন ছাড়া তা সহজ হবে না।
প্রস্তাবে আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ড থেকে বিদ্যুৎ আমদানির আর্থিক চাপের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ কেন্দ্রকে গত ১ মার্চ থেকে ভর্তুকির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু এই কেন্দ্রের জন্যই আগামী অর্থবছরে প্রায় সাত হাজার ৮২১ কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রেও বছরে প্রায় এক হাজার ৯৭৪ কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ গত এক দশকে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি আইন-২০১০-এর আওতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই বহু কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ফলে উৎপাদন না করলেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি মূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে বেড়ে ১৫ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছেছে। একইভাবে জ্বালানি তেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিপিডিবির সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণেই অতিরিক্ত ঘাটতি হবে প্রায় ১১ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য সমন্বয় করা গেলে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছে সরকার। যদিও এতে শিল্প ও সাধারণ ভোক্তা উভয় পর্যায়েই নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পাঠানো হয়েছে। চলতি মাসের ২০ তারিখের পর এ বিষয়ে গণশুনানির আয়োজন করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা দামের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে—ভর্তুকি বাড়ানো অথবা বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা। তবে বাস্তবতায় সরকার আপাতত ভর্তুকি বাড়ানোর দিকেই ঝুঁকতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, সব ধরনের জ্বালানি আমদানিতে বছরে ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়। ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ব্যয় প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, যার মধ্যে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।
বিপিডিবি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে এর অর্ধেক উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন:








