রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে যৌথ বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় ১৩ বছর পার হলেও প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এখনও নির্ধারিত হয়নি এবং বিচারপ্রক্রিয়াও শেষ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রত্যাশিত বিচার এখনও অধরা।
হেফাজতে ইসলামের নেতাদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে তারা বিচার চাওয়ার সুযোগ পাননি। বিচার দাবি করতে গিয়ে অনেকেই হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখে পড়েছেন বলে দাবি তাদের। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
২০১৩ সালের ৫ মে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতে ইসলামের ডাকে সারা দেশ থেকে আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত হন। দিনভর উত্তেজনার পর মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, এতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন পক্ষ দাবি করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি জানান, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে মোট ৫৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে হেফাজতে ইসলাম ৯৩ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে। ২০২১ সালে মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদনে ৬১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ‘শহীদনামা’ গ্রন্থে ৪১ জন নিহতের তথ্য রয়েছে। এসব তথ্যের কোনোটিই চূড়ান্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হেফাজতের নেতারা দাবি করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে এবং অজ্ঞাতনামা লাশ দাফনের ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে সমালোচকদের মতে, এত দীর্ঘ সময়েও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন না হওয়া একটি বড় ব্যর্থতা। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও এখনো প্রকাশিত হয়নি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি, ইতোমধ্যে সাক্ষ্য সংগ্রহসহ বিচারপ্রক্রিয়ার কিছু ধাপ এগিয়েছে।
ঘটনার স্মৃতি সংরক্ষণে ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’ নামে একটি সংগঠন গঠন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, মধ্যরাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পরপর গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। অনেকেই আহত অবস্থায় ছুটোছুটি করেন এবং ঘটনাস্থলে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে দাবি করেছেন তারা।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’সহ বিভিন্ন নামে অভিযান পরিচালিত হয়। তবে এ অভিযানকে ঘিরে বিতর্ক আজও অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের দাবি এখনও জোরালো রয়েছে।
আরও পড়ুন:








