জনপ্রশাসনে অনুমোদিত ১৯ লাখ ১৫১টি পদের বিপরীতে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে, যা মোট জনবলের প্রায় ২৫ শতাংশ। শূন্য পদ পূরণে কার্যকর নিয়োগ কার্যক্রম দৃশ্যমান না হওয়ার পেছনে ডিও লেটারের চাপ, নিয়োগবিধির পুরোনো কাঠামো, মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকিকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নানা মামলার কারণে অনেক নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে আছে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের তদবির এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করেই নিয়োগ দেওয়া সম্ভব, তবে বাস্তবতায় নানা চাপ মোকাবিলা করতে হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ বলেন, যেসব পদে আইনগত জটিলতা নেই, সেখানে নিয়োগের চেষ্টা চলছে। তবে সমস্যা থাকলে তা এড়িয়ে চলা হচ্ছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিয়োগে তদবিরের চাপ বেড়েছে এবং কোটা সুবিধা না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন পদ শূন্য থাকলে জনসেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি ৩০-৩৫ বছর আগের হওয়ায় তা দিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় নিয়োগ দেওয়া জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, নিয়োগ এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নিতে অনেকেই অনাগ্রহী।
নিয়োগে ডিও লেটারের চাপও বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। একজন সাবেক জেলা প্রশাসক জানান, মাত্র ৫০টি পদের জন্য ৫২টি ডিও লেটার পেয়েছিলেন তিনি। একাধিক সংসদ সদস্যের তদবিরের কারণে শেষ পর্যন্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে বদলি হতে হয় তাকে। স্বাস্থ্য খাতের এক কর্মকর্তা বলেন, একটি পদের বিপরীতে ৮০ থেকে ১২০টি পর্যন্ত ডিও লেটার আসে, যা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো অনিয়ম ঘটলেই তদন্ত, গণমাধ্যমের সমালোচনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে নিয়োগ কমিটির সদস্যদের মধ্যেও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে—৭৪ হাজার ৫৭৪টি। এরপর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৪৪ হাজার ৭৯০টি পদ খালি। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে ২৬ হাজার ১৭৪টি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ২০ হাজার ৩৮৯টি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ১৫ হাজার ১১৩টি এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ে ৯ হাজার ৭৯৬টি পদ শূন্য রয়েছে। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগবিধি আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি না হলে শূন্য পদ পূরণে স্থবিরতা কাটানো কঠিন হবে।
আরও পড়ুন:








