বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ও অর্থনীতির সম্প্রসারণ সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ তথ্য ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক ০৭ শতাংশ এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। শিল্পায়নের ধীরগতি, সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ এবং শ্রমবাজারের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা সারা দেশের শ্রমবাজারে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।
তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের হার আরও বেশি, যা ৯২ শতাংশের ওপরে। সেখানে কৃষি ও স্বকর্মসংস্থানভিত্তিক কাজই প্রধান জীবিকা হিসেবে রয়েছে। শহরাঞ্চলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান।
শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান ব্যাপক। স্নাতক বা সমমান শিক্ষিতদের ৫৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক পাসদের ৭০ দশমিক ৭১ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। একই সময়ে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ, যা অন্যান্য শিক্ষাগত স্তরের তুলনায় বেশি।
প্রতি বছর দেশে ২০ লাখের বেশি নতুন শ্রমশক্তি শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের একটি বড় অংশ ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দৈনন্দিন আয়নির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকে যাচ্ছে। এসব খাতে শ্রমিকরা সাধারণত শ্রম আইনের আওতায় না থাকায় নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পান না।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে অবদান রাখলেও অধিকাংশ শ্রমিক আনুষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, এ খাতে কর্মরত প্রায় ৯৫ শতাংশ শ্রমিকের কোনো লিখিত নিয়োগপত্র নেই।
নারী শ্রমশক্তির ক্ষেত্রেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নির্ভরতা বেশি। উচ্চ শিক্ষিত পুরুষদের মধ্যে যেখানে ৪৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, সেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে যুক্ত নারীদের বড় অংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প খাতের সীমিত বিস্তার এবং প্রাতিষ্ঠানিক খাতের অপর্যাপ্ত সম্প্রসারণের কারণে শ্রমবাজারে ভারসাম্য তৈরি হয়নি। ফলে শিক্ষিত ও অদক্ষ উভয় শ্রেণির শ্রমিকই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা, সহজ শর্তে নিবন্ধন ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং শ্রম আইন প্রয়োগের পরিধি বাড়ানো গেলে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আসতে পারে। এতে শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন:








