বৃহস্পতিবার

৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩

ফেসবুকে সাংকেতিক বিজ্ঞাপনে কিডনি বাণিজ্য, জড়িত আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৩০

শেয়ার

ফেসবুকে সাংকেতিক বিজ্ঞাপনে কিডনি বাণিজ্য, জড়িত আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট
ছবি এআই বানানো

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে সাংকেতিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অবৈধ কিডনি কেনাবেচার একটি সুসংগঠিত চক্র সক্রিয় রয়েছে। ‘ইমার্জেন্সি এ-পজিটিভ’ বা ‘ও-নেগেটিভ’ রক্তের প্রয়োজনের আড়ালে এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট বাংলাদেশ থেকে কিডনিদাতা সংগ্রহ করে পাকিস্তানের করাচিতে নিয়ে গিয়ে প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং এতে প্রশাসনের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেসবুকে ‘কিডনি ডোনার’, ‘কিডনি বিক্রি’ বা ‘কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট’ নামের অর্ধশতাধিক ক্লোজড ও ওপেন গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের কয়েকটিতে সদস্য সংখ্যা এক লাখের বেশি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে সরাসরি ‘কিডনি’ শব্দ ব্যবহার না করে কোড ওয়ার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে।

বর্তমানে একটি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য গ্রহীতাকে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হলেও দাতারা পাচ্ছেন মাত্র চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের ক্ষেত্রে এই মূল্য আরও বেশি। অর্থের প্রলোভনে পড়ে দরিদ্র মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্র তিনটি স্তরে কাজ করে—এজেন্ট, ফিক্সার এবং রানার। প্রথম স্তরে থাকা এজেন্টরা অভাবগ্রস্ত মানুষকে প্রলুব্ধ করে। দ্বিতীয় স্তরের ফিক্সাররা পাসপোর্ট, ভিসা ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করে। তৃতীয় স্তরের রানাররা পাকিস্তানে কিডনিদাতাদের গ্রহণ করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক বা ‘কিংপিন’ বিদেশে অবস্থান করে পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করে।

সূত্র জানায়, আগে ভারতের বিভিন্ন শহরে প্রতিস্থাপন করা হলেও ২০২৪ সালের পর ভিসা জটিলতার কারণে বর্তমানে পাকিস্তানের করাচি প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ও পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র জিম্মা রাখার ঘটনাও ঘটছে।

অনুসন্ধানে প্রশাসনিক সহযোগিতার অভিযোগও উঠে এসেছে। সম্প্রতি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক কিডনিদাতাকে বিদেশে পাঠানোর সময় এক সরকারি কর্মকর্তা মিথ্যা পরিচয়ে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি তার সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, কিডনি পাচার চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চক্রটি বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করায় এবং সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না রাখায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য চক্রটি ঢাকার কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে দাতাদের পাঠালেও এসব প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দাতাকে আত্মীয় হিসেবে দেখিয়ে প্রতিস্থাপনের অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক অনটন, প্রতারণা ও আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা এই অবৈধ বাণিজ্যকে উৎসাহিত করছে। তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী জানান, অর্থের প্রলোভনে কিডনি বিক্রিতে রাজি হলেও শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি বিমানবন্দরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেন এবং পাচার থেকে রক্ষা পান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।



banner close
banner close