রবিবার

৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯ আশ্বিন, ১৪৩৩

রেল পরিচালনায় ভুল নীতিতে লোকসান বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৫৯

শেয়ার

রেল পরিচালনায় ভুল নীতিতে লোকসান বাড়ছে
ছবি সংগৃহীত

দেশের রেলব্যবস্থায় নীতিগত দুর্বলতা ও ব্যবসায়িক ভারসাম্যহীনতার কারণে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশ পণ্য পরিবহনকে কেন্দ্র করে রেলের আর্থিক স্থিতি বজায় রাখছে, সেখানে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখনো যাত্রীনির্ভর কাঠামোয় আটকে রয়েছে। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে গিয়ে ব্যয় হচ্ছে ২০৯ টাকা।

ভারতে রেলের মোট আয়ের ৬৭ শতাংশের বেশি আসে পণ্য পরিবহন থেকে। এই আয়ের ওপর ভিত্তি করে যাত্রীসেবায় ভর্তুকি দিয়ে তারা আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ধরে রেখেছে। পাকিস্তানেও একই ধারা দেখা যায়, যেখানে পণ্য পরিবহন থেকে আসে ৩৩ শতাংশের বেশি রাজস্ব। উভয় দেশেই প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে ব্যয় প্রায় ৯৮ টাকার মতো।

অন্যদিকে বাংলাদেশে রেলের আয়ের বড় অংশ আসে যাত্রী পরিবহন থেকে, আর পণ্য পরিবহন থেকে আয় মাত্র ৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ খাতে গুরুত্ব না দেয়াই মূল সমস্যা। রোলিংস্টক সংকটের কথা বলা হলেও বাস্তবে রেলের ব্যবসায়িক কাঠামোয় পণ্য পরিবহনকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি।

এর প্রভাব স্পষ্ট ট্রেন পরিচালনায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নির্ধারিত কনটেইনার ট্রেন চলাচল নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছে। লোকোমোটিভ সংকটের কারণে অনেক সময় নির্ধারিত ট্রেন চালানোই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কনটেইনার পরিবহন কমে যাচ্ছে, আর রফতানিকারকরা বাধ্য হয়ে সড়কপথে ঝুঁকছেন।

বর্তমানে দেশের মোট পণ্য পরিবহনের ৯৬ শতাংশই সড়কপথে হচ্ছে, যেখানে রেলের অংশ মাত্র ৩ শতাংশ। এই অতিনির্ভরতা সড়কের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ও বৃদ্ধি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে উন্নত দেশগুলোতে রেল পরিচালিত হয় ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে। পণ্য পরিবহন থেকে লাভ করে সেই অর্থ দিয়ে যাত্রীসেবা পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর, বন্দর সংযোগ এবং স্টেশনভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশেও রেল অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। পদ্মা সেতু রেলপথ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার লাইন ও যমুনা রেলসেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগ সত্ত্বেও রেলের আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ এবং ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য পণ্য পরিবহনে রেলের অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ইঞ্জিন বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন। পণ্য পরিবহনকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলাদা করিডোর তৈরি, বন্দর সংযোগ জোরদার এবং রেলকে একটি লাভজনক পরিবহন মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে লোকসানের এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।