দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি–মার্চ) সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ঘটেছে ৬১টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার একাধিক ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে হত্যার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৩ সালে হত্যা মামলা ছিল ৩,০২৩টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৪৪২টিতে এবং ২০২৫ সালে তা ৩,৭৮৬টিতে পৌঁছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।
রাজধানীতে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চে ২৪টি খুনের ঘটনা ঘটে। এপ্রিলের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে গুলি করে, যা জনমনে ভীতি বাড়িয়েছে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজিমপুর দিক থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় মুখোশধারী এক ব্যক্তি পেছন থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরে কাছ থেকে আরও গুলি করে নিশ্চিত মৃত্যু ঘটিয়ে সহযোগীর মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। ঘটনার সময় আশপাশে থাকা মানুষ আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করে।
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সামনে সন্ত্রাসী তারিক সাইদ মামুনকে একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। কয়েক শ মানুষের সামনে এ ঘটনা ঘটলেও জড়িতদের গ্রেপ্তারের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তেজগাঁও এলাকায় সড়কে যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় মামুনকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে ভুবন চন্দ্র শীল নামে এক পথচারী নিহত হন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে গুলি করে হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিরাপত্তা তৈরি করছে। দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
পুলিশের দাবি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চলছে এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিনে মুক্ত হওয়া কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী রাজধানীতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুর নাম উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, হাজারীবাগ ও এলিফ্যান্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সক্রিয়তা বেড়েছে। এসব এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থান করে কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন:








