বুধবার

২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

আমলাতন্ত্রে মেধাভিত্তিক কাঠামো গড়তে চ্যালেঞ্জে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:২৩

শেয়ার

আমলাতন্ত্রে মেধাভিত্তিক কাঠামো গড়তে চ্যালেঞ্জে সরকার
ছবি এআই বানানো

বাংলাদেশে মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন বা মেরিটোক্রেসি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের সংস্কৃতির কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনে চ্যালেঞ্জে পড়েছে সরকার।

সাম্প্রতিক সময়ে সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বার্ষিক আয়োজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস ডিনারে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং বলেন, ভালো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দক্ষ জনপ্রশাসন একসঙ্গে কাজ করলে রাষ্ট্রীয় সাফল্য নিশ্চিত হয়। তার মতে, শক্তিশালী নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণকে উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়েছে সিঙ্গাপুরে, যেখানে প্রশাসনিক নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশেও জনপ্রশাসন সংস্কার ও মেধাভিত্তিক কাঠামো গঠনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে পেশাদার ও যোগ্যতাভিত্তিক করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সূত্র জানায়, প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল ও রদবদল শুরু হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে উপযুক্ত কর্মকর্তা বাছাইয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সচিব পদে নিয়োগের জন্য প্রাথমিক তালিকা তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক না হওয়ায় অগ্রগতি থমকে আছে। আবার যোগ্য বিবেচিতদের মধ্যে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কেবল যোগ্য লোক নিয়োগই যথেষ্ট নয়, তাদের কাজের স্বাধীনতা ও পেশাদার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, দলীয় আনুগত্যের প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮১ জন কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় কর্মরত আছেন, যার মধ্যে ২০ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন অধিদপ্তরে নতুন নিয়োগ ও রদবদলও হয়েছে।

অন্যদিকে, ফিটলিস্ট প্রণয়ন ও ডিসি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি ছাড়া টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রচলিত নিয়ম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএনও, ডিসি ও সচিব নিয়োগ একটি নির্ধারিত কাঠামো ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। তবে বাস্তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিবেচনার প্রভাবও থাকে।

সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, চুক্তিভিত্তিক ও নিয়মিত নিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে একাধিক সরকার প্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ কাঠামোগত সমস্যাকে আরও জটিল করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদিক হাসান বলেন, আমলাতন্ত্রের ভেতরেই একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী রয়েছে, যা সংস্কার উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে। ফলে রাজনৈতিক সরকারকে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সহযোগিতার ওপরই নির্ভর করতে হয়।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও অগ্রগতি সীমিত। ২০৮টি সুপারিশের মধ্যে আটটি অগ্রাধিকারভিত্তিতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র তিনটি।

জনপ্রশাসন উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, অতীতে প্রশাসনে দলীয় প্রভাব প্রবল ছিল। বর্তমানে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, তবে এটি সহজ নয়। তার মতে, নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য, যাতে যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে কার্যকর মেরিটোক্রেসি প্রতিষ্ঠা শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়া, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব একসঙ্গে কাজ করতে হবে।



banner close
banner close