বুধবার

২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তাধীন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:২১

শেয়ার

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তাধীন
ছবি সংগৃহীত

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে মঙ্গলবার জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের আগস্ট মাসে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ভারতের অনুরূপ কুদানকুলাম বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ বিভাগে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে।

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট (দুটি ১২০০ মেগাওয়াট ইউনিট)। রুশ সংস্থা রোসাটম এটি নির্মাণ করছে। প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ৯০ শতাংশ রাশিয়ার ঋণ। সাম্প্রতিক বিনিময় হার সমন্বয়ের কারণে ব্যয় আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে।

উত্তর সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গৌর গোবিন্দ গোস্বামীসহ গবেষকদের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, রূপপুরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লেভেলাইজড খরচ (LCOE) ৯ দশমিক ৩৬ সেন্ট, যা ভারতের কুদানকুলামের তৃতীয় ও চতুর্থ ইউনিটের ৫ দশমিক ৩৬ সেন্টের চেয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। নির্মাণ ব্যয়েও পার্থক্য রয়েছে। রূপপুরে প্রতি কিলোওয়াট নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৫ হাজার ২৭১ ডলার, অন্যদিকে কুদানকুলামে তা ৩ হাজার ১২৫ ডলার।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পের ব্যয়সংক্রান্ত কাগজপত্র রোসাটম সহজে দেখাতে চাইছে না, যা সন্দেহজনক। পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেছেন, রূপপুর থেকে কোন দামে বিদ্যুৎ কেনা হবে তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এজন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রূপপুর প্রকল্পে শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতির অভিযোগ বেশ আলোচিত। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। তাই এ প্রকল্প নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।

প্রকল্পে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে আবাসন খাতে আসবাবপত্র ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের ‘বালিশ কাণ্ড’ অন্যতম। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্য যুক্তরাজ্যপ্রবাসী টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ উঠেছে। দুদক এ অভিযোগ তদন্ত করছে। অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ বা রায় হয়নি।

রোসাটম একই প্রযুক্তিতে ভারত, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। তুরস্কের আক্কুইউ প্রকল্পে প্রতি ইউনিট নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরে ব্যয় বেশি হওয়ার পেছনে সাইট-নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ, প্রথমবারের প্রকল্প হওয়া, বিলম্ব ও বিনিময় হারের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এত বড় পার্থক্য তদন্তের দাবি রাখে।

প্রকল্পটি চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে বেসলোড সহায়তা মিলবে। তবে উৎপাদন খরচ ও ঋণ পরিশোধের চাপ জাতীয় অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত ট্যারিফ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর। বর্তমান সরকার প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।



banner close
banner close