পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আজ মঙ্গলবার জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির লক্ষ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
দুটি ইউনিট নিয়ে গড়ে ওঠা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্মাণ পর্যায় থেকে উৎপাদন প্রস্তুতি ধাপে প্রবেশ করছে। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজও সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে সরাসরি প্রায় আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং নির্মাণকাজে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, চলতি বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং এবং সেপ্টেম্বরে দুই ইউনিট মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ গত বছরের মে মাসে সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, জ্বালানি লোডিং পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এটি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; বরং একটি জটিল ও দীর্ঘ কারিগরি প্রক্রিয়ার সূচনা। এই ধাপের পর ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জনের মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা হবে এবং ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করার পর নিউক্লিয়ার ফিশন বা নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। সেই তাপে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘোরায় এবং বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। রূপপুরের ভিভিআর-১২০০ ডিজাইনের রিঅ্যাক্টরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপনে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে। এরপর ফিজিক্যাল স্টার্টআপ ও বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে মোট প্রায় ১০ মাস সময় লাগতে পারে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর, যা প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। একবার জ্বালানি লোড করার পর প্রায় দেড় বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময় পর পর আংশিক জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। মোট ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ ঋণ হিসেবে প্রদান করছে দেশটি, যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রোসাটমের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৬ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১২ টাকায় উন্নীত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন:








