দেশের অর্থনীতি যখন জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ব্যয়সংকোচনের বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য এই ক্রয়চুক্তি নীতি, অগ্রাধিকার এবং আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে চুক্তি সইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে এবং পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ নেওয়া হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় সরকারি ব্যয়ে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন চালু রয়েছে। যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়, বিদেশ সফরসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় সীমিত করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বড় অঙ্কের এই বিনিয়োগ সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, জ্বালানি সংকটে পরিবহন ও কৃষি খাত যখন চাপে, তখন বিপুল ঋণের দায় নিয়ে উড়োজাহাজ কেনা অগ্রাধিকারের প্রশ্ন তোলে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ঝুঁকিও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সহায়তা চেয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং সম্ভাব্য শুল্ক চাপ মোকাবেলায় কৌশলগত বিবেচনায় এই ক্রয়চুক্তি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এলএনজি ও কৃষিপণ্য আমদানিসহ বৃহত্তর বাণিজ্য সমঝোতার অংশ হিসেবেও বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও প্রকৃত চাহিদা বিবেচনা না করলে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সুদের হার ও মুদ্রাবিনিময় হারের ওঠানামার কারণে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ঘোষিত হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে। এর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রাংশের অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হলে সামগ্রিক চাপ আরও বাড়বে।
বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ, যা শিগগিরই কমে ১৯টিতে নামবে। সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে বহর ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের অধিকাংশ রুট স্বল্প ও মধ্যম দূরত্বের হওয়ায় বড় আকারের ড্রিমলাইনারের পরিবর্তে ছোট উড়োজাহাজ বেশি কার্যকর হতে পারে।
ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলও এ সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাঁদের মতে, এককভাবে বোয়িংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়লে ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। বিকল্প হিসেবে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিমানের মহাব্যবস্থাপক জনসংযোগ বোসরা ইসলাম জানান, পরিচালনা পর্ষদের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। উড়োজাহাজ সরবরাহ পেতে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তিনি আরও বলেন, নতুন উড়োজাহাজ কেনার অর্থায়ন ব্যাংকঋণের মাধ্যমে করা হবে এবং সরকার কেবল গ্যারান্টর হিসেবে থাকবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এমন বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্বচ্ছতা, পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিশ্লেষণ এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি সংস্থাটির ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি ও লাভজনকতা নিশ্চিত না হলে এই বিনিয়োগ জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আরও পড়ুন:








