দেশে গত দুই দশকে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে কার্যকর সমীক্ষা বা অনুসন্ধান হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময় পরিকল্পনা ও নথি প্রণয়নে সীমাবদ্ধ থাকায় জ্বালানি খাত ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে গ্যাসের ঘাটতি বাড়ার পাশাপাশি শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এ ঘাটতির কারণে আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাতে দীর্ঘদিন ধরেই সংকট চলছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান না করে ঘাটতি পূরণে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। গত আট বছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের পর দেশে বড় পরিসরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম নেওয়া হয়নি। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কয়েকটি ছোট গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই এখন উৎপাদনে নেই বা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পরও বঙ্গোপসাগরে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়নি।
বর্তমানে দেশে মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ধরা হয় প্রায় ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট গ্যাস বর্তমান হারে উত্তোলন করলে আরও প্রায় ১২ বছর চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতেও চাপ বাড়ছে। শিল্প মালিকদের মতে, নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যার ফলে কর্মসংস্থান কমছে এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) নেতারা জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে সরকার। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন রিগ কেনা, স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আহ্বান জানিয়ে দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়া না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
আরও পড়ুন:








