রবিবার

২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

ডিবির ‘ডাকাতি বাণিজ্য’ মামলায় তদন্তে গলদ, ছাড় পাচ্ছেন প্রভাবশালীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:৫১

শেয়ার

ডিবির ‘ডাকাতি বাণিজ্য’ মামলায় তদন্তে গলদ, ছাড় পাচ্ছেন প্রভাবশালীরা
ছবি এআই বানানো

রাজধানীর কাওলায় ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর সংঘটিত প্রায় ৫ কোটি টাকার ডাকাতি ও পরবর্তী সময়ে ডিবির তৎপরতা ঘিরে আলোচিত ‘ডাকাতি বাণিজ্য’ মামলায় তদন্তের নানা ত্রুটি ও প্রক্রিয়াগত দুর্বলতার কারণে জড়িত প্রভাবশালী কর্মকর্তারা দায়মুক্তি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তের পর বিভাগীয় মামলা হলেও প্রমাণ সংগ্রহে ঘাটতি, ফরেনসিক জটিলতা এবং পদমর্যাদাগত সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ঘটনায় সৌদি প্রবাসী রোমান মিয়ার প্রায় ৫ কোটি টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ থাকলেও পরবর্তীতে মামলায় তা উল্লেখ করা হয় প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা হিসেবে। তদন্তের সময় ডাকাতদের কাছ থেকে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা উদ্ধারের কথা বলা হলেও আদালতে দেখানো হয় মাত্র ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। বাকি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে ডিবির তৎকালীন দায়িত্বশীল কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

২০২১ সালে একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই অডিওতে অর্থ লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। তবে তদন্তে অডিওর উৎস যাচাই, সংশ্লিষ্ট ডিভাইস জব্দ এবং চেইন অব কাস্টডি নিশ্চিত করা হয়নি, যা প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্ত এবং পরবর্তী বিভাগীয় মামলায় দেখা যায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সুস্পষ্ট প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিএমপি মতিঝিল ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার দেওয়ান জালাল উদ্দিন চৌধুরী তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি এবং প্রয়োজনীয় কল ডিটেইল রেকর্ডের বেশিরভাগই সংরক্ষিত নেই। ফলে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা জটিল হয়ে পড়েছে।

অভিযুক্ত ডিবির তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার কায়সার রিজভী কোরায়েশী লিখিত ব্যাখ্যায় দাবি করেন, একটি অডিওর ভিত্তিতে তাকে দায়ী করা হয়েছে, যার উৎস ও অখণ্ডতা নিশ্চিত নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অধিকাংশ সাক্ষী তার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন, কিন্তু তা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করেছেন।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, এ ধরনের ঘটনায় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা থাকার সম্ভাবনা থাকে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া অডিও প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হয় না। সংশ্লিষ্ট ডিভাইস জব্দ ও আদালতের অনুমোদন ছাড়া ফরেনসিক পরীক্ষা হলে তা আইনি চ্যালেঞ্জে টিকবে না বলেও তিনি মত দেন।

পুলিশের ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হাতেনাতে ধরা পড়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও জড়িতদের শাস্তি না হলে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়মের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত আইজিপি প্রশাসন একেএম আওলাদ হোসেন বলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ঘটনাটির সময় ডিবির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা অর্থ আদায় ও ব্যবস্থাপনায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিভাগীয় তদন্তে মূলত নিম্নপদস্থ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রমাণ সংগ্রহে ঘাটতি, তদন্তের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বহুল আলোচিত এই মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।



banner close
banner close