রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর বিভিন্ন প্রকল্প ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও বিপুল সম্পদ অর্জনের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সিনিয়র প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলামসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটানো এবং কমিশনভিত্তিক অর্থ বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনিক নিয়ম উপেক্ষা করে তাকে সিনিয়র প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি ওই পদে বহাল রয়েছেন।
নথিপত্র তলব ও তদন্তের অগ্রগতি
গত ১৬ এপ্রিল দুদকের উপসহকারী পরিচালক তাছলীমা আক্তারের সই করা চিঠিতে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে বিটিভি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব, ক্রয় প্রক্রিয়ার বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট দলিল সংগ্রহ করা হচ্ছে।
যাদের তথ্য চাওয়া হয়েছে তারা হলেন—সিনিয়র প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. মান্নাফ হোসেন, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার মো. আরিফুল হাসান এবং রক্ষণ প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল হাদী। তাদের গত সাত বছরের বিদেশ সফরের বিবরণ, সফরের উদ্দেশ্য এবং অনুমোদনের তথ্যও জমা দিতে বলা হয়েছে।
বড় প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
দুদক সূত্র জানায়, প্রায় ১৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বেলজিয়ামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্টুডিওওয়াচ’-কে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে সাবেক মন্ত্রী ও তার পরিবারের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া বিটিভির টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের জন্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্পও প্রশ্নের মুখে। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তব প্রয়োজনীয়তা যাচাই ছাড়াই ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার আড়ালে প্রকল্পটি নেওয়া হয় এবং এতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে।
বিটিভির ১৪টি উপকেন্দ্রে সাব-স্টেশন স্থাপনের প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্র অনুযায়ী নতুন স্থাপনা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে পুরোনো অবকাঠামোর সঙ্গে সীমিত সরঞ্জাম সংযোজন করে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট কার্যক্রম
অভিযোগ অনুযায়ী, বিটিভির অধিকাংশ টেন্ডার কার্যত নিয়ন্ত্রণ করতেন মনিরুল ইসলাম। নির্দিষ্ট চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ বণ্টন, কম দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চ দরদাতাকে কাজ দেওয়া এবং কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও তদন্তে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রধান প্রকৌশলীর পদ শূন্য থাকায় প্রেষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারতেন না—এ সুযোগেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বলে অভিযোগ।
আধুনিকায়ন প্রকল্পে ত্রুটি ও ভাঙচুরের প্রসঙ্গ
বিটিভির কেন্দ্রীয় সম্প্রচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে একনেকে ১১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হলেও মানসম্মত যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়নি বলে মনে করছে দুদক। নিম্নমানের সরঞ্জাম ও ত্রুটিপূর্ণ ইনস্টলেশনের কারণে দ্রুতই যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ভাঙচুরের ঘটনাকে ব্যবহার করে পূর্বের অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে কিনা—তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুদকের বক্তব্য
দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানান, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় রেকর্ড ও আর্থিক দলিল সংগ্রহ করা হচ্ছে। নথিপত্র যাচাই শেষে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হবে এবং অনিয়মের প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া ২০২৩–২৪ ও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের রাজস্ব খাতে ক্রয়কৃত মালপত্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিল-ভাউচার, স্টক ও বিতরণ রেজিস্টার এবং অনুমোদনপত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তদন্তকারীরা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখছেন, রাজস্ব খাতের ব্যয় প্রকল্প ব্যয়ের সঙ্গে গুলিয়ে দেখানো হয়েছে কিনা।
আরও পড়ুন:








