নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও পাল্টা ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অবনতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যাংকিং খাতে চাপ বৃদ্ধির অভিযোগ তুলছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ। তবে স্বল্প সময়ের এই সরকারের সীমাবদ্ধতা ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ভিন্নমতও রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় বছরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ২০২৫ সালের জুন নাগাদ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায়। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ১১৩.৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
নীতি সুদের হার ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রায় ৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালে তা ১০ শতাংশে পৌঁছায়। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় নতুন বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।
ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, ওই সময়ে বেসরকারি খাতের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও নীতিগত সহায়তার ঘাটতি ছিল। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায় এবং নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই ধরনের মত প্রকাশ করেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার মামুন রশীদ। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
অন্যদিকে কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি জটিল সময়ে দায়িত্ব নেওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার দ্রুত সমাধান করা কঠিন ছিল। তারা প্রশাসনিক সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উদ্যোগকে গুরুত্ব দেন।
এ সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় ভোগব্যয় কমে এবং খুচরা বাজারে প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে।
বাণিজ্য খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, চুক্তির কিছু শর্ত দেশের রাজস্ব ও শিল্পখাতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোই ছিল এর উদ্দেশ্য।
জ্বালানি খাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হলে এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে পড়ে।
সার্বিকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতভেদ থাকলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরপেক্ষ মূল্যায়নের জন্য আরও গভীর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:








