ঢাকায় গত ১৫ মাসে সংঘটিত ৪৭৯টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৯৩টি রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ওয়ারী, গুলশান ও উত্তরা বিভাগে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় গত ৭ জানুয়ারি রাত সোয়া ৮টার দিকে মোটরসাইকেলে আসা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এটি রাজনৈতিক কোন্দলের জেরেই ঘটেছে। এর আগে, গত বছরের ২৫ মে মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় চায়ের দোকানে বসা অবস্থায় গুলিতে নিহত হন বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন। ঘটনাটিও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফল বলে মনে করা হয়।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মোট হত্যাকাণ্ডের মধ্যে প্রায় ৪০ দশমিক ২৯ শতাংশ রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয়েছে। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ওয়ারী বিভাগে সর্বোচ্চ ১১০টি হত্যা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮টিই রাজনৈতিক। গুলশান বিভাগে ৫৬টি হত্যার মধ্যে ২৮টি এবং উত্তরা বিভাগে ৫৪টির মধ্যে ২৬টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া মিরপুরে ৮০টি, তেজগাঁওয়ে ৬১টি, মতিঝিলে ৪৮টি, লালবাগে ৪২টি ও রমনায় ২৮টি হত্যার ঘটনা ঘটে।
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে, সংখ্যা ৭৫। একই বছরের জুনে ৪৯টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি হত্যার ঘটনা ঘটে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির মতো অর্থনৈতিক স্বার্থ বড় ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ প্রবণতাকে আরও উসকে দিচ্ছে বলেও তারা মনে করেন।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের প্রতিযোগিতা থেকে এসব সহিংসতা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কখনও কখনও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হলে হত্যাকাণ্ডকে ‘রাজনৈতিক’ তকমা দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়, যা তদন্তের দায় কমিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও ধর্মীয় নেতাদের সম্মিলিত ভূমিকা জরুরি।
পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, অপরাধ দমনে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কেউ সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে আগাম তথ্য দিলে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। পাশাপাশি দ্রুত গ্রেপ্তার, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা গেলে তা অপরাধীদের জন্য শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দলের ভেতরে কেউ অপরাধে জড়ালে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সহিংসতা কমানো কঠিন হবে।
আরও পড়ুন:








