দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনা রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের একটি বহুতল ভবন ধসে ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক প্রাণ হারান এবং হাজারো মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলাসহ পাঁচটি মামলার একটিরও বিচার এখনো শেষ হয়নি, মূলত আইনি জটিলতা ও স্থগিতাদেশের কারণে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে রয়েছে।
ঢাকার বিচারিক আদালত সূত্রে জানা যায়, হত্যা মামলায় ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। পরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে কয়েক বছর বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকে। বর্তমানে কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আগামী ৩০ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ফয়সাল মাহমুদ জানান, অভিযোগ গঠনের পর কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ নেওয়ায় দীর্ঘ সময় বিচার বন্ধ ছিল। বর্তমানে বিচারপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে এবং দ্রুত রায় পর্যায়ে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে।
ইমারত নির্মাণ আইনে দায়ের করা আরেকটি মামলায় ২০১৬ সালের ১৬ জুন বিচার শুরু হলেও বিভিন্ন আইনি জটিলতায় তা বারবার স্থগিত হয়। বর্তমানে মামলাটি অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। অতিরিক্ত পিপি ইশতিয়াক হোসেন জিকু জানান, মামলাটিতে দীর্ঘদিন স্থগিতাদেশ ছিল। বর্তমানে আংশিক স্থগিতাদেশ বহাল থাকলেও অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চলছে। গত ২০ এপ্রিল সাক্ষীদের হাজিরার জন্য প্রসেস জারি করা হয়েছে।
এ ছাড়া অনুমোদিত ছয় তলা ভবনকে ১০ তলায় রূপান্তরের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে যুক্তিতর্ক পর্যায়ে রয়েছে। ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ শুনানি না হওয়ায় আগামী ১৭ মে নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে।
রানা প্লাজা ধসের পর অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা পৃথক দুটি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। এ দুটি মামলায় সোহেল রানাকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা দুটি বিচারাধীন। সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীরা উপস্থিত না হওয়ায় আগামী ৩০ এপ্রিল নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. বদরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ভবনটির মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে এবং একাধিক মামলা দায়ের করায় বিচারপ্রক্রিয়া জটিল হয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, ভবনটি সোহেল রানার বাবার নামে নিবন্ধিত ছিল।
দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপ থেকে ১ হাজার ১১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। জীবিত উদ্ধার হন ২ হাজার ৪৩৮ জন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৫২৪ জন আহত এবং ৭৮ জন স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেন। অশনাক্ত ২৯১টি মরদেহ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়েছে। ২৩ এপ্রিল রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় শ্রমিক নেতারা বলেন, দীর্ঘসূত্রতা বিচারপ্রাপ্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল আয়োজিত সভায় ওয়ার্কার্স রিসোর্স সেন্টারের চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেন, নিহত শ্রমিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে একটি যৌথ তদারকি কমিটি গঠন জরুরি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনায় শ্রমিকরাই বারবার প্রাণ হারালেও মালিকপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রানা প্লাজা ধস দেশের শ্রম নিরাপত্তা ও শিল্প ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছিল। তবে এক যুগ পরও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন:








