শুক্রবার

২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১১ বৈশাখ, ১৪৩৩

বিদ্যুৎ সংকট আরও বাড়বে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:৩৪

শেয়ার

বিদ্যুৎ সংকট আরও বাড়বে
ছবি সংগৃহীত

জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি বাড়ছে, যা আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে আরও তীব্র লোডশেডিংয়ে রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস, কয়লা ও এলএনজি সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতা, ডলারের উচ্চমূল্য এবং আমদানিনির্ভরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক কেন্দ্র সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে।

পাওয়ার গ্রিড অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্যে দেখা গেছে, গতকাল বিকাল ৫টায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ২ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট ঘাটতি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধান আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেল, কয়লা ও এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যা আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গ্রীষ্মে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করলেও অর্থসংকটের কারণে এলএনজি আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কম চালিয়ে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে এবং গ্রীষ্মে লোডশেডিংমুক্ত পরিস্থিতির কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে সেচ কার্যক্রম সচল রাখতে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং সমন্বয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকাকে আপাতত লোডশেডিংমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলে উৎপাদন হতে পারে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট, ফলে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণে লোডশেডিং ছাড়া বিকল্প নেই বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিদ্যুৎ খাতে ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিলেও এর ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। নির্দিষ্ট খাত ছাড়া অন্যত্র ভর্তুকি স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়নি। এতে কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ডলারের দাম বা জ্বালানির মূল্য আরও বাড়লে এই ভর্তুকির পরিমাণও বাড়বে।

অন্যদিকে পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ব্যাপক বেড়েছে। আগে একটি কার্গো এলএনজি আমদানিতে যেখানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লাগত, এখন একই পরিমাণ আমদানিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি এবং ভর্তুকির চাপ—এই তিনটি কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।



banner close
banner close