বৃহস্পতিবার

২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১০ বৈশাখ, ১৪৩৩

ইফতি ওভারসিজের ধোঁকাবাজি মালদ্বীপে বৈধপথে অবৈধ জনশক্তি পাচার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:২৮

শেয়ার

ইফতি ওভারসিজের ধোঁকাবাজি মালদ্বীপে বৈধপথে অবৈধ জনশক্তি পাচার
ছবি এআই জেনারেট

মালদ্বীপে কর্মী পাঠানোর অনুমোদনকে পুঁজি করে ব্যাপক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে রিক্রুটিং এজেন্সি ‘দ্য ইফতি ওভারসিজ’-এর বিরুদ্ধে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্দিষ্ট শর্ত লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটি ভিন্ন কোম্পানিতে কর্মী পাঠানো, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং স্বল্পমেয়াদি ভিসায় শ্রমিক পাঠানোর মতো গুরুতর অনিয়মে জড়িত—এমন তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান শাখা-৪ থেকে ‘ফেডো প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে মালদ্বীপের একটি প্রতিষ্ঠানে ১৫০ জন কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। শর্ত অনুযায়ী কর্মীদের বাসস্থান, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা কোম্পানিকে নিশ্চিত করার কথা ছিল। কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা হয় দৈনিক ৮ ঘণ্টা এবং চুক্তির মেয়াদ দুই বছর। বেতন ধরা হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ মার্কিন ডলার।

এছাড়া সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় কর্মীপ্রতি সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ব্যাংকিং চ্যানেলে গ্রহণের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব শর্তের কোনোটি মানেনি প্রতিষ্ঠানটি।

গত ৬ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৭৫টি ছাড়পত্র যাচাই করে দেখা গেছে, কর্মীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে, যা নির্ধারিত ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি। শুধু তাই নয়, যেসব কোম্পানিতে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে সেখানে কাউকে পাঠানো হয়নি।

মালদ্বীপের সরকারি ওয়েবসাইটে ভিসা যাচাই করে দেখা যায়, কর্মীদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির নাম উল্লেখ রয়েছে। যেমন—‘Huravee Farm’, ‘One Realty Pvt Ltd’, ‘White Garden Investment’, ‘Villa Shipping and Trading Company’, ‘Suria H&R Pvt Ltd’, ‘Maldives Ports Ltd’সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে তাদের দেখানো হয়েছে। অথচ বিএমইটির ছাড়পত্রে সবার ক্ষেত্রেই নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ফেডো প্রাইভেট লিমিটেড’ উল্লেখ রয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেখানে চুক্তির মেয়াদ দুই বছর হওয়ার কথা, সেখানে অধিকাংশ কর্মীর ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ মাত্র দুই থেকে তিন মাস। এতে কর্মীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

মালদ্বীপে অবস্থানরত কয়েকজন কর্মীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিশ্রুত বেতন না পেয়ে তারা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। একজন কর্মীর মা জানান, তার ছেলে প্রতিশ্রুত রিসোর্টে কাজ পাননি এবং বর্তমানে মাত্র ২৫০ ডলার বেতনে কাজ করছেন, যদিও তাকে ৩৫০ ডলার দেওয়ার কথা ছিল। বিদেশে যেতে তার খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা।

এদিকে, কিছু কর্মী জানিয়েছেন, তারা এখনো কাজ পাননি এবং একটি কক্ষে অবস্থান করছেন। কয়েক দিনের মধ্যে কাজ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও কেউই অনুমোদিত কোম্পানিতে কাজ পাননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দ্য ইফতি ওভারসিজের ম্যানেজিং পার্টনার মো. রুবেল দাবি করেন, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে এবং তিনি কাগজপত্র দেখাবেন বলে জানান। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি তা উপস্থাপন করেননি।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। যুগ্ম সচিব মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএমইটির মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ূন কবীর বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত ফাইলের ভিত্তিতেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে বিষয়টি তার জানা ছিল না এবং তিনি খোঁজ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাকের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, চুক্তিভঙ্গ এবং ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী পাঠানো স্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন। এমন ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগের অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিজ উদ্যোগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।



banner close
banner close