মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগের মধ্যেই রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা বড় বাধা হিসেবে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব মামলা নিষ্পত্তি না হলে শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় বৈঠক করে ইতিবাচক সাড়া পেলেও, বৈঠকে বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মালয়েশিয়া। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মামলাগুলো ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত নিষ্পত্তির বিষয়টি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার চাহিদা অনুযায়ী সক্ষম অনেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেই ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এ অবস্থায় বিশেষ সেল গঠন করে দ্রুত এসব মামলা নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছু ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা ও অংশীদারত্ব দাবি করা হয়। এতে অসম্মতি জানালে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন, ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জনশক্তি রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মামলা জটিলতার কারণে দেশে ফিরতে পারছেন না। এতে মালিকবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ রয়েছে। বন্ধের আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী দেশটিতে গিয়েছিলেন।
মামলাসংক্রান্ত একটি ঘটনায় ২০২৪ সালের আগস্টে একটি ওভারসিজ রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচার ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন উল্লেখ করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয় এবং মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তবে পরবর্তীতে মামলাটি পুনরায় তদন্তাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পৃথক অনুসন্ধানে মানব পাচার বা অর্থ পাচারের প্রমাণ পায়নি বলে জানায়। দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে এসব মামলাকে অসত্য উল্লেখ করে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়।
তবে মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মালয়েশিয়া ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানায়, যার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের পরিচালক মেরিনা সুলতানা বলেন, নিরীহ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায় এবং তা দেশের জন্য ক্ষতিকর। তিনি দ্রুত এসব মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, নিরীহ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তিনি দ্রুত হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান বলেন, মিথ্যা মামলার কারণে অনেক ব্যবসায়ী সামাজিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং কেউ কেউ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি জানান।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা গেলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়ার পথ সুগম হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আরও পড়ুন:








