মঙ্গলবার

২১ এপ্রিল, ২০২৬ ৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

ঝুঁকিতে গুম কমিশনের স্পর্শকাতর নথি, নেই সুস্পষ্ট সংরক্ষণ নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ০৭:২৩

শেয়ার

ঝুঁকিতে গুম কমিশনের স্পর্শকাতর নথি, নেই সুস্পষ্ট সংরক্ষণ নির্দেশনা
ছবি সংগৃহীত

সদ্য বিলুপ্ত গুম কমিশনের অতি গোপনীয় নথিপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ বর্তমানে সংরক্ষণ ঝুঁকিতে রয়েছে। আইনগতভাবে এসব দলিল কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় নথিগুলো কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় মানবাধিকার কমিশনে পড়ে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব তথ্যপ্রমাণ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গেলে গুম সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সংগৃহীত গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।

গুম কমিশনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘ অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাওয়া বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি ছিল। তবে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় কমিশনের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এতে নথিপত্রের ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট এক সূত্রের ভাষ্য, এসব ডকুমেন্টের কারণে প্রভাবশালী অনেকেই জড়িত হতে পারেন, ফলে সেগুলো গায়েব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

গুম কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কমিশনের নথিপত্র মানবাধিকার কমিশনের সচিবের জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে বর্তমানে সেগুলোর অবস্থা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে গুম কমিশনে তলব করা হয়। তাদের মধ্যে কেউ লিখিত বক্তব্য দেন, আবার কেউ সরাসরি হাজির হয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেন। এ সময় ডিজিএফআই, এনএসআই, র‌্যাব ও পুলিশের সাবেক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের অডিও-ভিডিও ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন গোপন বন্দিশালা থেকে উদ্ধার করা হয় গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

সূত্র আরও জানায়, সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. জেনারেল (অব.) আকবর হোসেনসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি গুম সংক্রান্ত ঘটনায় তথ্য দিয়েছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সাক্ষ্যও রেকর্ড করা হয়েছে। কমিশনের অনুসন্ধানে ফোনকল রেকর্ড, এসএমএস এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণও পাওয়া যায়, যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে।

কমিশন বিলুপ্তির পর এসব নথিপত্র কাওরানবাজারে মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। দাপ্তরিক ফাইল ছাড়াও ২৪টি কার্টনে সংরক্ষিত বিভিন্ন ডকুমেন্ট সেখানে রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে তদন্তে ব্যবহৃত পাঁচটি ল্যাপটপ থেকে তথ্য মুছে সরকারকে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ল্যাপটপ থেকে তথ্য মুছে ফেলা হলেও তা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সেগুলো বেহাত হলে গোপন তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি থেকে যায়। এতে ভুক্তভোগী, সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান ব্যবস্থায় এসব নথিপত্র সংরক্ষণ করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, আইনগতভাবে এ দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায় না এবং এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনাও নেই। সাবেক কমিশনের সভার কার্যবিবরণীতেও এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে কর্মকর্তারা উদ্বেগের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন এবং জরুরি ভিত্তিতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, কাওরানবাজারে মানবাধিকার কমিশনের একটি কাচঘেরা কক্ষে (৯১৭ নম্বর) সাধারণ তালা দিয়ে রাখা হয়েছে এসব নথিপত্র। কক্ষটির ভেতরে স্তূপ করে রাখা রয়েছে ফাইল ও কার্টন, তবে অতিরিক্ত কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা চোখে পড়েনি।

মানবাধিকার কমিশনের সচিব কুদরত-ই-এলাহী বলেন, গুম কমিশনের অভিযোগ ও তদন্ত কার্যক্রম তাদের আওতায় আনার পরিকল্পনা থাকলেও অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে অথবা কমিশন পুনর্গঠনের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

গুম কমিশনের সাবেক কমিশনার ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, এসব নথিপত্র নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের কষ্টের তুলনায় তা তেমন কিছু নয়। এখন রাষ্ট্র এসব তথ্যপ্রমাণের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।

উল্লেখ্য, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে গুম কমিশন গঠন করে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এ কমিশনে সদস্য হিসেবে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, সাজ্জাদ হোসেন এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস। পরবর্তীতে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হলে কমিশনের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।



banner close
banner close