দেশে চলমান জ্বালানি সংকট ও ভর্তুকির চাপের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করছে সরকার। বাসাবাড়িতে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পাশাপাশি পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও তিনটি বিকল্প প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি বিদ্যুতের গড় মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম। ফলে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাইকারি দামে তিন বিকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী,
ইউনিটপ্রতি ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ৭.৫৪ টাকা করা হলে ভর্তুকি কমবে প্রায় ৫,২৪৪ কোটি টাকা
১ টাকা বাড়িয়ে ৮.০৪ টাকা করা হলে সাশ্রয় হবে প্রায় ১০,৪৮৯ কোটি টাকা
১ টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮.২৪ টাকা করা হলে ভর্তুকি কমতে পারে ১২,৫৮৬ কোটি টাকা পর্যন্ত
খুচরা গ্রাহকদের ওপর প্রভাব
খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি রাখা হয়েছে। শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ‘লাইফলাইন’ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম না বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তবে অন্যান্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে ধাপে ধাপে ৭০ পয়সা থেকে ১.৮০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সংকটের পেছনের কারণ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু মার্চ ও এপ্রিল মাসেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। জ্বালানি তেলে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
আইএমএফের পরামর্শ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
আইন ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
আইন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এর। সাধারণত গণশুনানির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। তবে ২০২২ সালের সংশোধনের পর সরকার সরাসরি গেজেটের মাধ্যমে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায়, যা নিয়ে স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জনমনে উদ্বেগ
এরই মধ্যে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দৈনন্দিন জীবনে। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দাম বাড়ানো নয়, বরং উৎপাদন খাতে অপচয় ও অদক্ষতা কমিয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের দিকেও জোর দেওয়া প্রয়োজন। বিকল্প জ্বালানি উৎসের ব্যবহার বাড়ানো গেলে আমদানি নির্ভর ব্যয় কমানো সম্ভব বলেও মত তাদের।
মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য বিইআরসিতে পাঠানো হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আরও পড়ুন:








