অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দেশে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চুক্তির শর্ত, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিভিন্ন মহল ভিন্নমত প্রকাশ করছে। চুক্তিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত হয় এবং পরে এর শর্তাবলি প্রকাশিত হলে আলোচনা বাড়ে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে সীমিত শুল্ক সুবিধা পাবে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্লিখিত পণ্যের মধ্যে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল মাত্র ১৪টি পণ্য, যার মোট মূল্য প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত সংশ্লিষ্ট পণ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় শুল্ক কমালে সরকারের রাজস্ব কমতে পারে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ রাজধানীতে এক সমাবেশে বলেন, চুক্তির কিছু ধারা দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিষয়টি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে পর্যালোচনা প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, জ্বালানি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত শর্তগুলো ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারণে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, চুক্তির কিছু বিধান ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর সীমিত করতে পারে। একই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম চুক্তিটিকে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেন। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজও মনে করেন, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে কিছু শর্ত দেশের নীতিগত স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
চুক্তিতে বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ক্রয় এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও বিমান কেনার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি অশুল্ক বাধা কমানো, আমদানি লাইসেন্সিং নীতি সহজ করা এবং কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি মানদণ্ড গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, উন্নত বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যদি চুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং দেশীয় শিল্পকে উপযোগী নীতিসহায়তা দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিটি কার্যকর করতে সংসদীয় অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য চুক্তির শর্তসমূহ পর্যালোচনা করে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:








