জ্বালানির ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। রাজধানীতে পরিস্থিতি তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও গ্রামাঞ্চলে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা দেখা দিচ্ছে, ফলে তীব্র গরমে জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাতেও ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। আকস্মিক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় নগর ও গ্রাম—উভয় এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানিতে জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফলে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াচ্ছে, যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত করতে পারে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট—ঘাটতি প্রায় ২ হাজার ২৬ মেগাওয়াট। বিকেলে উৎপাদন বাড়লেও ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। এদিন বিকেল ৫টায় ১৪ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ১৪৮ মেগাওয়াট, তখনও ঘাটতি ছিল এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, আগামী মাসে চাহিদা বেড়ে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে লোডশেডিং আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংস্থাটির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। রামপাল ও এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টসহ কয়েকটি কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রেও শিগগির উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সীমিত আকারে চালানো হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে বকেয়া বিল ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর পাওনা সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত জানান, তেলের সংকটে বেসরকারি খাতের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকলে আরও ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতো।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে শিল্প, ব্যবসা ও কৃষি খাতে। গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, সময়মতো পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বোরো ধান চাষ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে এবং মাছের হ্যাচারিতেও উৎপাদন কমেছে।
বরিশাল, বাগেরহাট, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। শিল্প এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে পালাক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা উৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং আর্থিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন:








