অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সময় নিয়োগ পাওয়া বিপুলসংখ্যক সরকারি আইনজীবী এখনো বহাল থাকায় আইন অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পার হলেও এসব নিয়োগে দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসায় বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আইন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আসিফ নজরুলের দেড় বছরের দায়িত্বকালে নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত ব্যাপকসংখ্যক সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। বিদ্যমান আইনে অ্যাটর্নি জেনারেল ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকলেও ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের সংখ্যা নির্ধারিত নয়। একইভাবে জেলা পর্যায়ে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমা না থাকায় এই সুযোগে অতিরিক্ত নিয়োগের অভিযোগ ওঠে।
বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ১০৩ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এবং ২৩০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) কর্মরত রয়েছেন, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে জানা গেছে। এ সংখ্যার যৌক্তিকতা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কিছু আইন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অযোগ্যতার অভিযোগও রয়েছে। ইতোমধ্যে এক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, সব আইন কর্মকর্তার কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে এবং প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও পরিবর্তন এসেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তন করা হয়েছে এবং নতুন কয়েকজন প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, কিছু প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
নিম্ন আদালতে পিপি নিয়োগ নিয়েও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সারা দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা দেখা দেয়। এমনকি মৃত ব্যক্তিকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার থাকার অভিযোগও ওঠে। ঢাকার আদালতগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও আলোচিত হয়।
আইনজীবীদের একাংশ মনে করছেন, দ্রুত এসব বিতর্কিত নিয়োগ পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি আইন কাঠামোর ভেতরে অদক্ষতা ও অনিয়ম স্থায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।
তবে আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। সংসদের আইন প্রণয়নসংক্রান্ত ব্যস্ততার কারণে এ প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে, পূর্ববর্তী সময়ে দেওয়া নিয়োগ বহাল রাখা নাকি নতুন করে কাঠামোগত সংস্কার আনা—এই প্রশ্ন এখন আইন অঙ্গনে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:








