দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬৫ শতাংশ কেন্দ্র কার্যত অলস পড়ে আছে। ৩২ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে মাত্র ১০ থেকে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা আসন্ন গ্রীষ্মে চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাস, কয়লা ও তেল—তিন জ্বালানির ঘাটতির কারণে প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। উৎপাদনে না থেকেও এসব কেন্দ্রের জন্য সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এক অর্থবছরেই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) এ খাতে ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি গুনতে হয়েছে।
বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াটে। অর্থাৎ প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতা ব্যবহারহীন। একইভাবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সাড়ে সাত হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াটের মতো। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
দেশে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ও ভারত থেকে আমদানি মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বর্তমান চাহিদার কাছাকাছি। তবে গ্রীষ্ম মৌসুমে এ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সংকট বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে গ্যাসভিত্তিক ৫৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৯টি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গত এক দশকে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে দৈনিক ২৫৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই আমদানিনির্ভর এলএনজি।
এদিকে কয়লার জোগান ঘাটতিও উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। যদিও কিছু মজুত রয়েছে, তবুও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নীতি ও আমদানিনির্ভরতা বর্তমান সংকটকে তীব্র করেছে। তাদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান বন্ধ রেখে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া অর্থও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিডিবির মোট বকেয়া ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে গ্যাস বিল ১৯ হাজার কোটি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। বকেয়া না পাওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি আমদানিতে হিমশিম খাচ্ছে, যা উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
আরও পড়ুন:








