মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি ঘিরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর দায়ের করা শতাধিক মামলার প্রেক্ষাপটে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ভুক্তভোগী বা অর্থ পাচারের প্রমাণ ছাড়াই দায়ের হওয়া এসব মামলার কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কার্যত থমকে আছে। এদিকে, পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চলমান মামলাগুলোর নিষ্পত্তিকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রধান শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে মালয়েশিয়া।
মূল অভিযোগ অনুযায়ী, সরকার অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানো সত্ত্বেও ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। যদিও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একটি মামলার তদন্তে অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেয় সিআইডি। তবুও পরবর্তীতে একই ধরনের অভিযোগে দুদকের মামলা দায়ের প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ মামলার এজাহারে নির্দিষ্ট কোনো ভুক্তভোগীর নাম-ঠিকানা নেই এবং অর্থ পাচারের কোনো সুস্পষ্ট আলামতও উল্লেখ করা হয়নি। অভিযোগের ধরন প্রায় অভিন্ন, যেখানে প্রতিটি এজেন্সির পাঠানো শ্রমিকসংখ্যার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক হিসাব করে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অর্থ কীভাবে, কোন মাধ্যমে এবং কোথায় পাচার হয়েছে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই।
এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা বায়রার বিভিন্ন পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ অভিযুক্ত ওই সময় কোনো পদে ছিলেন না। একইভাবে বিএমইটি ও বায়রার শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কোনো শ্রমিকের বিদেশ গমন সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকেও তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এমনকি দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে পাঠানো এক চিঠিতে মামলাগুলোকে অসত্য উল্লেখ করে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। বাংলাদেশ থেকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হলেও পরবর্তীতে মামলা অব্যাহত থাকে বলে জানা গেছে।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম জানিয়েছেন, অনুসন্ধান পর্যায়ে প্রাথমিক ভিত্তিতে মামলা করা হয় এবং তদন্তের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য উদঘাটিত হয়। মামলায় ত্রুটি থাকলে তা বিচারপ্রক্রিয়ায় সংশোধনের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও চলমান মামলাগুলোর নিষ্পত্তিকে প্রধান শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে। যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, স্বচ্ছ, ন্যায্য ও ব্যয়মুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। মালয়েশিয়া একটি ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও জানিয়েছে, যার লক্ষ্য দালালচক্রের প্রভাব কমানো এবং নিয়োগ ব্যয় নিয়োগকর্তার ওপর নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হলে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে, যা দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।
আরও পড়ুন:








