রাজধানী থেকে গ্রাম-সবখানেই নীরবে বিস্তার লাভ করছে মাদকের ভয়াবহ প্রভাব। সহজলভ্যতা ও নতুন নতুন সরবরাহপথের কারণে দেশের সামাজিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে তরুণ সমাজ, আর এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত পড়ছে পরিবার, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতায়।
রাজধানীর বাড্ডার সাততলা বস্তিতে রিকশাচালক ২৩ বছরের ফয়সাল বাবুর কথাই যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। দৈনিক আয়ের বড় অংশই চলে যায় ইয়াবা কিনতে। সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেলেও নেশার দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারছেন না তিনি। তার মতো হাজারো তরুণ নীরবে আসক্তির ফাঁদে আটকে পড়ছে।
শুধু ইয়াবা নয়, হেরোইন, গাঁজা, প্যাথেড্রিন, এলএসডি, আইস (ক্রিস্টাল মেথ) ও কোকেইনের মতো মাদক এখন সহজেই মিলছে। সাম্প্রতিক সময়ে হাইড্রিল ও স্কার্ফ লেমন সিরাপের মতো সস্তা মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি কিটামিনের মতো বিপজ্জনক সিনথেটিক ড্রাগও নতুন করে বাজারে প্রবেশ করেছে। সীমান্ত, সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার—সব পথ ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি চক্র মাদক সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই মাদক বিস্তারের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে। অল্প আয়ের মানুষ নেশার খরচ মেটাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ কমাচ্ছে, অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। পরিবারে বাড়ছে কলহ, ভাঙছে সম্পর্ক, এমনকি মাদককে কেন্দ্র করে ঘটছে খুনের ঘটনাও।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা, দুর্বল নজরদারি এবং সহজলভ্যতা—এই চারটি কারণ মাদক পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারও এই সংকটকে জটিল করেছে। ডার্ক ওয়েব, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাচারকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে।
সাম্প্রতিক এক অভিযানে রাজধানীতে কিটামিন প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাবের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। একটি আন্তর্জাতিক চক্র ডার্ক ওয়েব ও কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে বিদেশে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল। অভিযানে বিপুল পরিমাণ কিটামিন ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে এবং বিদেশি নাগরিকদের আটক করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত এক মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, এলএসডি ও অন্যান্য মাদক জব্দ করা হয়েছে। তবুও সরবরাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না, কারণ পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশে মাদকের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত। ইয়াবা আসে মূলত টেকনাফ-কক্সবাজার এলাকা দিয়ে, আর ফেনসিডিল ও হেরোইন আসে পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে। আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে কোকেইন ও সিনথেটিক ড্রাগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং এবং তরুণদের জন্য ইতিবাচক বিকল্প তৈরি করা। পাশাপাশি মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করাও জরুরি।
মাদকের এই নীরব মহামারী এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সব স্তরে এর প্রভাব পড়ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও গভীর ঝুঁকির মুখে পড়বে।
আরও পড়ুন:








