বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আন্তর্জাতিক কল ব্যবসাকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক গেটওয়ে অপারেটরস ফোরাম (আইওএফ) সিন্ডিকেটের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে—এই সিন্ডিকেটের মূল নেপথ্য কারিগররা আদৌ আইনের আওতায় আসবেন কি না, নাকি আগের মতোই প্রভাববলয়ের আড়ালে থেকে যাবেন।
খাত-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক টপোলজির আড়ালে গত এক দশকে সরকারের প্রায় আট হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ‘দরবেশ’খ্যাত সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন সাতটি আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটরের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আইওএফ কাঠামোর অধীনে গঠিত ‘মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ (এমডিএফ/এমডিএস) থেকে ৫৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) রাজধানীর গুলশান থানায় মামলা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছ অডিট ছাড়া অতীতের অনিয়মের পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। টেলিকম বিশেষজ্ঞ নুরুল কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র জানতে পূর্ণাঙ্গ টেকনো-কমার্শিয়াল অডিট জরুরি। আইওএস কাঠামো, রেট নির্ধারণ পদ্ধতি এবং এমডিএস ব্যয়ের ফরেনসিক অডিট ছাড়া প্রকৃত তথ্য উদঘাটন কঠিন হবে।
নীতিমালা থেকে বিচ্যুতি
২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে প্রণয়ন করা হয় আইএলডিটিএস নীতিমালা। এর লক্ষ্য ছিল ভিওআইপি জালিয়াতি বন্ধ, রাজস্ব সুরক্ষা এবং একটি কাঠামোবদ্ধ বাজার তৈরি করা। এ নীতিমালায় আন্তর্জাতিক কল আইজিডব্লিউ থেকে আইসিএক্স হয়ে মোবাইল অপারেটরে পৌঁছানোর তিনস্তর বিশিষ্ট ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়।
তবে ২০১৫ সালে বিটিআরসির নির্দেশনায় চালু করা ‘আইজিডব্লিউ অপারেটরস সুইচ’ (আইওএস) ব্যবস্থার মাধ্যমে আইওএফ একটি পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক টপোলজি চালু করে। অভিযোগ রয়েছে, এর ফলে সব আন্তর্জাতিক কল একটি কেন্দ্রীয় পয়েন্ট দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল আইওএফের হাতে। এতে প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয় এবং কিছু অপারেটরের মধ্যে রাজস্ব বণ্টনে অসাম্য সৃষ্টি হয়।
ফ্লোর রেট ও রাজস্ব ক্ষতি
আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশনের জন্য সরকার নির্ধারিত ‘ফ্লোর রেট’ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে বেশি দামে কল টার্মিনেশন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু রাজস্ব ভাগাভাগি হয়েছে নিম্ন ফ্লোর রেট ধরে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ সিন্ডিকেটভুক্ত গোষ্ঠীর কাছে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে বিটিআরসি একাধিকবার ফ্লোর রেট কমালেও আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে দৈনিক কল মিনিট ১০ কোটি থেকে নেমে এক কোটির কিছু বেশি হয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্বও কমে গেছে।
এমডিএফ তহবিল নিয়ে প্রশ্ন
আইওএফ কাঠামোর অধীনে গঠিত এমডিএফ/এমডিএস তহবিলে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা হয়েছে ৬৩১ কোটির বেশি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৬২৫ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের বড় অংশ একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে, যার নামে কোনো আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নেই।
মামলা ও তদন্ত
এমডিএফ থেকে ৫৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালে দায়ের করা মামলায় ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ (সংশোধনী ২০১০) এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়। ইতোমধ্যে ১২ জন আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন।
তবে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ
সাম্প্রতিক এক বৈঠকে আইওএফ ও আইজিডব্লিউ অপারেটরদের মধ্যকার অপারেশনাল চুক্তির অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিটিআরসি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাপনায় নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং কার্যকর প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে তবেই এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এখন দেখার বিষয়—তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে এগোয় এবং প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না।
আরও পড়ুন:








